ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: ইসরাইলিদের মধ্যে ‘প্রতারিত’ হওয়ার অনুভূতি
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: ইসরাইলিরা ‘প্রতারিত’ বোধ করছে

ইসরাইলের রেহোভোত শহরের হার্জল স্ট্রিটের পাশে অবস্থিত ‘ট্রি ব্রাসেরি’ রেস্তোরাঁয় আসা মানুষজন আজ একটি বিষয়ে একমত। মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ইসরাইলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর—এ নিয়ে কারো মনে কোনো দ্বিধা নেই। ইসরাইলের ৫৫ বছর বয়সি প্রকৌশলী আভি পেরেজ আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।’

সেখানে উপস্থিত সবার মধ্যেই একটি সাধারণ বিশ্বাস কাজ করছে—ইসরাইল আগের চেয়েও বেশি বিপদগ্রস্ত এবং এই বিপদের মুখোমুখি তাদের একাই হতে হবে। রেস্তোরাঁর মেন্যু কার্ড দেখতে দেখতে ৩৫ বছর বয়সি শাহাম নোভিক বলেন, ‘ব্যাপারটা অদ্ভুত। এই তো সেদিন আমরা সন্তানদের নিয়ে বোমার শেল্টারে ছিলাম... আর আজ সবকিছু স্বাভাবিক ভাবা হচ্ছে। কিন্তু কোনো সমস্যারই তো সমাধান হয়নি।’

রেহোভোত: মধ্য-ইসরায়েলের প্রতিচ্ছবি

তেল আবিব থেকে ১২ মাইল দূরে অবস্থিত এই রেহোভোত শহরটিকে ভোটদাতাদের মানসিকতা পরিমাপের জন্য সবসময় ‘মধ্য-ইসরায়েল’ বা একটি আদর্শ মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। বৈচিত্র্যময় এবং গভীরভাবে বিভক্ত এই দেশের প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে আজ ইসরাইলি এবং প্রাইড পতাকা উড়তে দেখা যাচ্ছে। এক মোড়ে তীব্র শব্দে রেভ মিউজিক বাজছে, তো অন্য মোড়ে জড়ো হয়েছেন অর্থোডক্স ইহুদি পুরুষরা। সপ্তাহান্তের যানজটের মাঝে চলছে নতুন বাস সিস্টেম তৈরির নির্মাণকাজ। অনেকে এসেছেন খবরের মানসিক চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লেবাননে নতুন সংঘাত

শুক্রবার (১৯ জুন) সকালের খবরের বড় অংশ জুড়েই ছিল লেবাননে নতুন করে শুরু হওয়া তীব্র সংঘাতের খবর। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর হামলায় চার ইসরাইলি সেনা (যার মধ্যে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন) নিহত হওয়ার পর, ইসরাইলি বিমানবাহিনী লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে ১৮ জন নিহত এবং ৩৩ জন আহত হয়েছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

তবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তিতে মোটেই খুশি হতে পারছে না ইসরায়েলিরা। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তিকে বহু ইসরাইলি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় বিশ্লেষকরা একে একটি ‘আত্মসমর্পণ’ এবং ‘লজ্জাজনক চুক্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন, যা ইসরাইলের চরম আশঙ্কার চেয়েও খারাপ।

চুক্তির প্রভাব ও উদ্বেগ

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চুক্তির ফলে ইরান যুদ্ধের আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে পুনর্গঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি লেবাননের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এই চুক্তি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতাকে সীমিত করে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে, যা দেশটির উত্তরের অঞ্চলের জন্য বড় হুমকি।

রাজনৈতিক কৌশলবিদ এবং আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইন ম্যানেজার উদি তেন্নে বলেন, ‘ইসরাইলিরা বিশ্বাস করে লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি একটি ন্যায্য যুদ্ধ। ইসরাইলে বসবাসকারী প্রত্যেকেই বোঝে যে ইরান এবং হিজবুল্লাহ আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’

লেবানন সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে অবস্থিত উত্তরের শহর মেতুলাতেও মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা গেছে। ড্যানিয়েল ডর্ফম্যান নামের এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী বলেন, ‘ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে সবাই খুব খুশি ছিল, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এই চুক্তিটি ইসরাইলের জন্য মোটেও ভালো হয়নি... এটি একটি মস্ত বড় ভুল।’

যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা

অনেকে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং ব্যালেস্টিক মিসাইল পুরোপুরি নির্মূল করার মতো যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জনে ইসরাইলের ‘চরম ব্যর্থতা’র কথা বলছেন। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ যুদ্ধ শুরু করার পর, যুদ্ধ শেষে ইসরাইল আজ ওয়াশিংটনের কাছে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এমনকি গত সপ্তাহে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে একটি ‘ছোট শক্তি’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়ে পরামর্শ নেওয়ার পরিবর্তে, ট্রাম্পের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে কটু কথা ও সমালোচনা। বিশেষ করে লেবাননে ইসরাইলের অনবরত হামলায় ৩,৯০০-এরও বেশি বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটন।

ইসরাইলি দৈনিক ‘ইয়েদিওথ আহরোনথ’-এর কলামিস্ট নাদাভ ইয়াল লিখেছেন, ‘ইসরাইলের শাসনব্যবস্থার একটি বড় অংশের মনের ভেতর এখন যে কী পরিমাণ ‘ধাক্কা’ এবং ‘কষ্ট’ কাজ করছে, তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তাদের ক্ষতস্থানে এখন যেন লবণ ছিটিয়ে দেওয়া হচ্ছে।’

নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ ও আসন্ন নির্বাচন

৭৬ বছর বয়সি নেতানিয়াহু, যিনি বর্তমানে দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি, এখন ভোটারদের বোঝানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছেন যে কেবল তিনিই ইসরাইলিদের নিরাপদ রাখতে পারেন। ইসরাইল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জনমত বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তামার হারম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু নিজের লক্ষ্যগুলো এত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে এক ধরনের অহংকার দেখিয়েছিলেন। যখন আপনি লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হন, তখন মানুষ আপনাকে প্রতিশ্রুতির খেলাপকারী হিসেবেই গণ্য করবে।’

রেহোভোত শহরে ফিলিস্তিনি নাগরিকের সংখ্যা খুবই কম। ফলে এটি ইহুদি ভোটারদের মনোভাব বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা, যারা ইসরাইলের মোট ভোটারের তিন-চতুর্থাংশ। আগামী অক্টোবরে দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিরোধী দলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গত সপ্তাহে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচন দেশের জন্য একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে। এটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বাড়িয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।’

২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আকস্মিক হামলায় ১,২০০ জন নিহত এবং ২৫০ জন অপহৃত হওয়ার পর থেকেই নেতানিয়াহুর ওপর সমর্থকদের আস্থা গভীরভাবে কেঁপে ওঠে। এরপর গাজায় ইসরাইলের নৃশংস ও রক্তক্ষয়ী অভিযানে ৭৩,০০০-এরও বেশি মানুষ নিহত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ইসরাইল একঘরে হয়ে পড়ে।

ইসরাইল বর্তমানে গাজার ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও, বাকি অংশের ২.৩ মিলিয়ন মানুষের ওপর এখনো হামাসের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযানও কোনো চূড়ান্ত ফলাফল এনে দিতে পারেনি।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও সমর্থন

এত কিছুর পরও নেতানিয়াহুর কিছু অনুগত সমর্থক এখনো রয়েছেন। গত সপ্তাহে যখন সাধারণ ভোটারদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে ইরানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য কে সবচেয়ে যোগ্য, তখন ৪৩ শতাংশ মানুষ নেতানিয়াহুর জোটের পক্ষেই মত দিয়েছেন। যেমনটা ব্রাসেরি রেস্তোরাঁয় বসে আভি পেরেজ বলছিলেন, ‘নেতানিয়াহুও মানুষ, তাই কিছু ভুল তিনি করতেই পারেন। কিন্তু তিনি জানেন কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। ইসরাইলের কী প্রয়োজন তা তিনি বোঝেন। তিনি দেশের কথা বলেন, আর ট্রাম্প বলেন তার ব্যবসার কথা।’

এই ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কারণে আসন্ন নির্বাচনটি অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, রাজনীতির চতুর খেলোয়াড় নেতানিয়াহু হয়তো আবারও তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করতে পারেন। অধ্যাপক হারম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি তিনি বিপদে আছেন, কিন্তু তিনি শেষ মুহূর্তে কী চাল চালবেন তা বলা মুশকিল। তিনি রাজনীতির ‘হুডিনি’ (যাদুকর)।’

তবে রেহোভোতের ৩৪ বছর বয়সি চিকিৎসক লি নোভিক মনে করেন, ইসরাইলিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিভক্ত। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু বছরের পর বছর ধরে আমাদের বিভক্ত করার চেষ্টা করে আসছেন এবং তিনি সফল হয়েছেন। আর এই সুযোগে দেশের মূল সমস্যাগুলো যেমন—বাড়ির দাম বৃদ্ধি বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইরান যখন বলে তারা ইসরাইলকে ধ্বংস করতে চায়, আমি তা বিশ্বাস করি। কিন্তু এই সরকার যুদ্ধকে ব্যবহার করে বিভেদ সৃষ্টিকারী আইন পাস করছে এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।’

বিভক্তি ও ঐক্যের টানাপোড়েন

বিরোধীদের মতেও, ইহুদি ইসরাইলিরা এখন আগের চেয়ে বেশি বিচ্ছিন্ন। তবে অধ্যাপক হারম্যান এই চরম বিভক্তির তত্ত্বের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন। তিনি মনে করেন, নব্বইয়ের দশকের মতো আগেও এমন মেরুকরণ দেখা গেছে। তার মতে, বেশিরভাগ ইহুদি ভোটারদের মূল চাওয়াগুলো একই—একটি উদার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কিন্তু শক্তিশালী সামাজিক কল্যাণ তহবিল, সুরক্ষার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ অবাস্তব বলে মনে করা।

আপাতত, অধিকাংশ নাগরিকই লেবাননের যুদ্ধকে সমর্থন করছেন এবং অর্থোডক্স ইহুদি সম্প্রদায়কে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান থেকে ছাড় দেওয়ার আইনের তীব্র বিরোধিতা করছেন।

রেহোভোত শহরের বাসিন্দা ৫৫ বছর বয়সি ডালিয়া পেরেজ গত সপ্তাহের ঘটনাগুলো থেকে একটি চূড়ান্ত শিক্ষা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি যুদ্ধের অবসানের আশা করেছিলাম, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমাদের চিরকাল তরবারির ওপর ভর করেই বেঁচে থাকতে হবে। আমরা এখন বুঝতে পেরেছি যে আমাদের কোনো বন্ধু নেই এবং আমরা কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না।’