বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক ঢাকা-কুয়ালালামপুর সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যা দীর্ঘদিনের সংকীর্ণ ও একপেশে সম্পর্কের গতিপথ পরিবর্তনের সুযোগ এনে দিয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
বিগত কয়েক দশক ধরে ঢাকা-কুয়ালালামপুর সম্পর্কটি খুবই সংকীর্ণ ও একপেশে সম্পর্কের মধ্যে আটকে ছিল। বাংলাদেশ শুধু সস্তা, অদক্ষ শ্রমের জোগানদাতা আর উচ্চ আয়ের মালয়েশিয়া তার ভোক্তা। এই সেকেলে ‘জনশক্তি রপ্তানি’ মডেল দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত সম্ভাবনাকে আড়াল করে রেখেছে এবং উভয় দেশের ভাবমূর্তি বারবার ক্ষুণ্ন করেছে।
ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশের নতুন সরকার তার পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট ও কৌশলগত বার্তা দিয়েছে—আমরা এখন থেকে আরও জোরালোভাবে পূর্ব এশিয়ার দিকে তাকাব। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরে এশিয়ার দুই শক্তিশালী দেশ ভারত ও চীন—উভয় দেশের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ পেয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রিমিয়ার লি কিয়াংয়ের এই দ্রুত আমন্ত্রণ ছিল আঞ্চলিক ভারসাম্যের এক ভূরাজনৈতিক খেলা। তবে ঢাকা সুচিন্তিতভাবে তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছে। বেইজিং এবং নয়াদিল্লির আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে একটি ‘বাফার’ অংশীদার হিসেবে কুয়ালালামপুরকে অগ্রাধিকার দেওয়া ঢাকার নীতিনির্ধারকদের পরিপক্ব কূটনৈতিক পদক্ষেপ।
সম্পর্কের বর্তমান বাস্তবতা ও সম্ভাবনা
তবে এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে দুঃখজনক সত্য হলো—আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ বা মালয়েশিয়া কোনো দেশই সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রকৃত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি। অথচ দুই দেশের প্রশাসনের মধ্যে বোঝাপড়ার ভিত্তি বেশ মজবুত।
২০২৪ সালের শেষভাগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রথম বিদেশি সরকারপ্রধান হিসেবে ঢাকা সফরে এসেছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসও মালয়েশিয়া সফর করেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই শীর্ষ পর্যায়ের সফরগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক প্রটোকল, ফটোসেশন ও কিছু কাগুজে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে; কোনো বাস্তবিক ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত রূপান্তর আনতে পারেনি।
কয়েক দশক ধরে মালয়েশিয়ায় একটি বড় বাংলাদেশি সমাজ গড়ে উঠেছে, যেখানে বাংলাদেশিরা সস্তা শ্রমের বৃত্ত ভেঙে সফল শিক্ষাবিদ, উদ্যোক্তা ও বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। ২০২৬ সালের জুনের শুরুতে কুয়ালালামপুরে ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন মালয়েশিয়া’ (ডুয়াম) আয়োজিত একটি ইভেন্টে আমি যোগদানের আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। এই সংগঠন মালয়েশিয়ায় কর্মরত ও অধ্যয়নরত বাংলাদেশি একাডেমিশিয়ান ও শিক্ষার্থীদের মেধা, অনন্য অবদান ও শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিগ ডেটা খাতে কাজ করা একদল তরুণ বাংলাদেশি উদ্যোক্তা সম্পর্কে জানতে পারি, যাঁরা মালয়েশিয়ার সরকারি ও বেসরকারি খাতের উচ্চপর্যায়ের গ্রাহকদের সেবা দিচ্ছেন।
সম্পর্কের রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা
আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সাক্ষী যে একজন বাংলাদেশি সঠিক সুযোগ পেলে মালয়েশিয়ার উন্নয়নে সমভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে। দুই প্রধানমন্ত্রীর উচিত অতীত ভুল পেছনে ফেলে সহযোগিতার সূচনা করা। তবেই এই সফর দুই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের নতুন যুগের সূচনা করবে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি একাডেমিশিয়ানদের অবস্থান এখন শক্তিশালী ও গৌরবজনক। কিন্তু এই মেধাবী ও উদ্যোক্তাদের এই সাফল্যের গল্পগুলোকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে লালন বা তাকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বড় করার জন্য এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঢাকা-কুয়ালালামপুর সম্পর্কটি ঐতিহাসিকভাবে একটি সংকীর্ণ ও বৈষম্যমূলক সমীকরণে আটকে ছিল। একদিকে বিপুল জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশ, যা শুধু সস্তা ও অদক্ষ শ্রমের সরবরাহকারী। অন্যদিকে উচ্চ আয়ের মালয়েশিয়া, যা ওই শ্রমের ভোক্তা। এই সেকেলে ‘জনশক্তি রপ্তানি’ মডেল দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃত সম্ভাবনাকে আড়াল করেছে এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের থাবায় উভয় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ আজ আর কেবল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং মালয়েশিয়ার উচ্চ মূল্যের খাতগুলোর অন্যতম প্রধান অর্থায়নকারী। মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি আয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা। শীর্ষ ২ শতাংশ মোস্ট-সাইটেড (সর্বাধিক উদ্ধৃত) বিদেশি গবেষকদের একটি বড় অংশই বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ। এমএম২এইচ স্কিমে উচ্চবিত্তের পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। তাই দুই দেশ যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ও ডেটা সেন্টারের মতো শিল্পায়নের নতুন পর্বে প্রবেশ করছে, তখন এই সম্পর্ককে অদক্ষ শ্রমের বৃত্ত থেকে বের করে একটি জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক ‘যৌথ সমৃদ্ধির ব্লুপ্রিন্টে’ রূপান্তর করা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বার্তা
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার এই ঐতিহাসিক প্রথম বিদেশ সফরটি যেন পুরোনো ও সস্তা শ্রমনির্ভর মানসিকতার অবসান ঘটায়। মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত আমাদের শিক্ষার্থীদের একটি দক্ষ কর্মীশক্তিতে রূপান্তর করতে আপনাকে ‘গ্র্যাজুয়েট প্লাস’ উদ্যোগের প্রস্তাব টেবিলে রাখতে হবে, যা মেধার ভিত্তিতে পোস্ট-স্টাডি ওয়ার্ক রাইটস নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে দেশের উদ্বৃত্ত প্রযুক্তি-দক্ষ প্রকৌশলী এবং পলিটেকনিক স্নাতকদের মালয়েশিয়ার চিপ-প্যাকেজিং ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে যুক্ত করার জন্য একটি বিশেষ চুক্তি প্রয়োজন। একটি রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ৩০০ জনের পাইলট প্রকল্প দিয়ে শুরু করে আগামী ১০ বছরে ৩০ হাজার টেকনিশিয়ানকে মালয়েশিয়ার অ্যাসেম্বলি হাবগুলোতে পাঠানো গেলে, তা থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার (১৮ হাজার কোটি টাকা) আয় সম্ভব। এই তরুণেরা যখন বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরবে, তখন তারা দেশের মাটিতে নিজস্ব হাইটেক ও সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেমের ভিত গড়বে, যা ‘ব্রেন ড্রেন’-কে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তর করবে। এ ছাড়া আমাদের কারিগরি শিক্ষা নেটওয়ার্ককে মালয়েশিয়ার কৃষিপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে ‘প্রিসিশন ফার্মার’ (আধুনিক প্রযুক্তি, তথ্য ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে যাঁরা নির্ভুলভাবে কৃষিকাজ করেন) গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা খাতে ৫ শতাংশ জিডিপি বরাদ্দ করার লক্ষ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান সংস্কারে মালয়েশিয়ার দিকনির্দেশনা নিতে হবে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বার্তা
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি পুত্রজায়া ও প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের জন্য নতুনভাবে সম্পর্ককে সাজানোর একটি সুযোগ এনে দিয়েছে; যা বাংলাদেশকে সস্তা শ্রম সরবরাহকারী না দেখে উচ্চ আয়ের দেশের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবে। মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি ও ডেটা সেন্টার খাতে প্রায় ৬০ হাজার দক্ষ প্রকৌশলীর যে শূন্যতা রয়েছে, তা পূরণে বাংলাদেশের আইটি ও ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতকদের দ্রুত কাজে লাগানো সম্ভব। এ ছাড়া পূর্ব মালয়েশিয়ার পিছিয়ে থাকা সাবাহ ও সারাওয়াক অঞ্চলে আধুনিক কৃষি ব্যবসার প্রসারে বাংলাদেশের সামাজিক উদ্ভাবন ও কৃষিপ্রযুক্তির মডেলগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।
আশার কথা, পুত্রজায়ায় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক শেষে যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়েছে, তা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা ভেঙে একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিবাচক যে, দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার পরিপক্ব সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও বাংলাদেশের আইটি খাতের মেলবন্ধনের বিষয়ে একমত হয়েছেন। লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি দ্বিপক্ষীয় ‘ট্যালেন্ট কো–অপারেশন ফ্রেমওয়ার্ক’-এর প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মাধ্যমে প্রকৌশল স্নাতকদের দক্ষ করা হবে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীরা পদ্ধতিগতভাবে দক্ষ হয়ে উঠবে। তবে মূল চ্যালেঞ্জটি ফলোআপ বা অগ্রগতি পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নে। প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক কমিটির ওপর নির্ভর না করে দুই দেশের বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটি ‘সিটিজেন নেটওয়ার্ক’ গঠন করা উচিত। এর মাধ্যমে কুয়ালালামপুর ও ঢাকার মধ্যে কৌশলগত মেলবন্ধন তৈরি হবে, যা আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারকেই থেমে থাকবে না।
পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থানের মূল চাবিকাঠি ছিল উভয়ের ওপর নির্ভর করা এবং মানবসম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার। আমার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা সাক্ষী যে একজন বাংলাদেশি সঠিক সুযোগ পেলে মালয়েশিয়ার উন্নয়নে সমভাবে নেতৃত্ব দিতে পারে। দুই প্রধানমন্ত্রীর উচিত অতীত ভুল পেছনে ফেলে সহযোগিতার সূচনা করা। তবেই এই সফর দুই দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের নতুন যুগের সূচনা করবে।
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং আইডিইএএসের সিনিয়র ফেলো। তিনি মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মালায়ায় অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। মতামত লেখকের নিজস্ব।



