এনপিএ'র অভিযোগ: মার্কিন চুক্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর 'তাবেদারি' একমত
নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) দাবি করেছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো শত বিষয়ে দ্বিমত করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদারির প্রশ্নে যেন একমত হয়ে গেছে। সংগঠনটি বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং দেশটি একটি বৈশ্বিক সংঘাতের অংশে পরিণত হচ্ছে।
অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তব্য
শুক্রবার (১৩ মার্চ) রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এনপিএ কর্তৃক দেশবিরোধী মার্কিন চুক্তি স্থগিতের দাবিতে আয়োজিত অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা এসব কথা বলেন। সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির ফলে একদিকে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে, অন্যদিকে আমরা একটি বৈশ্বিক সংঘাতের অংশে পরিণত হচ্ছি। সব মিলিয়ে এক ধরনের পরাধীনতার শৃঙ্খল আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।"
মেঘমল্লার বসুর বক্তব্য
এনপিএ’র সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য মেঘমল্লার বসু বলেন, "বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত ছিল— যখন বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত থাকে, তখন সব পক্ষ থেকে কীভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া যায়, সেই কৌশল গ্রহণ করা। কিন্তু আমরা তা না করে এমন একটি চুক্তি করেছি, যার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি কার্যত বিকিয়ে দিতে হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা নিজেরা কখনোই আমাদের দেশের খনিজ বা জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবো না। কারণ মার্কিন কোম্পানিগুলো আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত এবং তাদের কাছে উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে। ফলে ঘুরেফিরে আমাদের সেই চুক্তিগুলো মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গেই করতে হবে। এর মাধ্যমে জ্বালানি খাতের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত ক্ষেত্রেও আমরা আমাদের স্বার্থ একরকম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিচ্ছি।"
মেঘমল্লার বসু কৃষি খাতের উদাহরণ টেনে বলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বায়োটেকনোলজির মাধ্যমে যেসব বীজ তৈরি করা হয়, দীর্ঘমেয়াদে এসব বীজ বাংলাদেশের কৃষির জন্য কী ধরনের ক্ষতি ডেকে এনেছে। আগে কৃষকের হাতে যে বীজের নিয়ন্ত্রণ ছিল, তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এই চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা বায়োটেকনোলজিক্যাল পণ্য বা বীজ নিজের মতো করে আর পরীক্ষা বা পর্যালোচনা করতে পারবে না। এটি মূলত এক ধরনের একতরফা চাপ ছাড়া আর কিছু নয়।"
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা
মেঘমল্লার বসু বলেন, "বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো শত বিষয়ে দ্বিমত করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদারির প্রশ্নে যেন একমত হয়ে গেছে। তারা সবাই ভেবেছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তেল না দিয়ে আমরা ক্ষমতায় যেতে পারবো না। তাহলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা চায় তার ব্যাপারে আগে সাইন করে দেই। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার—বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান কখনো কোনও একটি রাজনৈতিক দলের মাধ্যমে হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বুঝতে পেরেছিল যে— ভারতের সঙ্গে যেসব চুক্তি হচ্ছিল, তার অনেকগুলোই ছিল অধীনতামূলক। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের মানুষ এটাও বুঝে ফেলবে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তিগুলো করা হচ্ছে, সেগুলোও এক ধরনের অধীনতার চুক্তি।"
নাজিফা জান্নাতের বক্তব্য
এনপিএ’র মুখপাত্র নাজিফা জান্নাত বলেন, "আমরা এনপিএ বলতে চাই যে বাংলাদেশ যেসকল দেশের সাথে চুক্তি করবে সবগুলো সমর্যাদার ভিত্তিতে হতে হবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থ সেখানে মাথায় রাখতে হবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাই যে রাজনৈতিক দলগুলো যখন হচ্ছে গিয়ে স্বার্থের বাংলাদেশের কথা বলে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কথা বলে তখন কেবলমাত্র তারা ভারতের নামটাই উল্লেখ করে। আমরা বলতে চাই ভারত-আমেরিকাসহ পৃথিবীর যত দেশের সাথে আমাদের চুক্তি হবে; সব দেশের সাথে বাংলাদেশের সমমর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের জায়গাটা মাথায় রাখতে হবে।"
অবস্থান কর্মসূচির দাবিসমূহ
অবস্থান কর্মসূচিতে এনপিএ’র সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য অনিক রায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। দাবিগুলো হলো:
- যেসব চুক্তি এখনো সংসদে অনুমোদিত হয়নি, জাতীয় সংসদে অনুমোদন স্থগিত রাখতে হবে; গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ব্যাপক আইনি পর্যালোচনার দাবি করতে হবে এবং ৪,৫০০টি মার্কিন পণ্যে তাৎক্ষণিক শূন্য শুল্কের মতো সবচেয়ে ক্ষতিকর ধারাগুলোর বাস্তবায়ন কার্যকরভাবে স্থগিত রাখতে হবে।
- মালয়েশিয়া ও কম্বোডিয়ার সঙ্গে আমেরিকার চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির আনুষ্ঠানিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ সরকারকে প্রকাশ করতে হবে। মালয়েশিয়া কৃষি জৈবপ্রযুক্তি ও ভর্তুকি তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে যে স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করেছে, বাংলাদেশও তা দাবি করতে পারে। কম্বোডিয়ার মতো এলডিসি সুবিধা বাংলাদেশকেও দিতে হবে।
- ভূরাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন খর্ব করা ধারাগুলো প্রত্যাখ্যান করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষায় জিএমও আমদানির বিরুদ্ধে ডব্লিওটিও’র কাঠামো ব্যবহার করতে হবে। বাণিজ্য আলোচনাকে জিএসওএমআইএ ও এসিএসএ-এর মতো প্রতিরক্ষা চুক্তির দাবি থেকে আলাদা রাখতে হবে।
- ৩০ দিনের মধ্যে স্বাধীন অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। একটি স্বাধীন ও বহুবিভাগীয় কমিশন গঠন করতে হবে।
অন্যান্য উপস্থিত ব্যক্তিত্ব
অবস্থান কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন— এনপিএ’র সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য বাকি বিল্লাহ, মাঈন আহমেদ, অলীক মৃ প্রমুখ।
