মেয়ের মাথায় আদুরে বিলি কাটছেন নীলা হাসদা। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বীরগ্রামে দেখা যায় এই দৃশ্য। বরেন্দ্রভূমির গহিনে অবস্থিত সাঁওতালপল্লি বীরগ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটি শুকনো খারি (খাল)। বৈশাখের তপ্ত রোদে খালটি এখন শুকিয়ে খটখটে। এর পাড়ের বাঁশঝাড় থেকে শুকনা পাতা সংগ্রহ করছিলেন এক নারী, যার পরনে নীল চেক শার্ট ও মাথায় লাল গামছা।
নাকফুলের স্মৃতি
ওই নারীর সোনার নাকফুলটি চোখে পড়ে। ছোট্ট অথচ সুন্দর। প্রশংসা করতেই তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে যায়, চোখে জল আসে। জানা যায়, তিনি সাঁওতাল নারী নীলা হাসদা, বীরগ্রামের গৃহবধূ ও দিনমজুর। তাঁর স্বামী মোমিন টুডুও মজুরের কাজ করেন। নীলা জানান, নাকফুলটি তাঁর বড় চাচি (বোড়ো মা) ছোটবেলায় বানিয়ে দিয়েছিলেন। চাচি জমিতে খাটতেন, আর চাচা আগেই মারা গিয়েছিলেন। চাচির কোনো সন্তান ছিল না, তাই নীলাকে খুব আদর করতেন।
কষ্টের স্মৃতি
নীলা বলেন, বড় চাচি এখন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন। কাজ করতে না পেরে ভাতিজারাই তাঁকে দেখছে। নিজের পরিবারের জন্য নীলা তাঁকে দেখতে যেতে পারেন না। বড় চাচির কথা মনে পড়লেই তাঁর চোখে জল আসে। শৈশবে নীলা ছিলেন সাত ভাই-বোনের মধ্যে। অভাবের সংসারে তিনবেলা খাবার জুটত না। নিঃসন্তান বড় চাচি নীলাকে বেশি ভালোবাসতেন, কাছে ডেকে খেতে দিতেন। নাকফুল পেয়ে নীলা দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মেয়ে হয়েছিলেন। চাচি জড়িয়ে ধরে চুমু এঁকেছিলেন। তিনি পাড়াময় ঘুরে সবাইকে নাকফুল দেখিয়েছিলেন। বিয়ের পরও সেটি খোলেননি।
মেয়ের জন্য নাকফুল
নীলার একটি মেয়ে আছে, দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। তিনি চান মেয়ে লেখাপড়া শিখে বড় হোক, নিজের জীবনের মতো না হয়। নিজের রোজগারের টাকা দিয়ে তিনিও মেয়ের জন্য নাকফুল গড়েছেন। নাকফুল পেয়ে মেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়েছিল। তখন তাঁর চাচির কথাই মনে পড়েছিল।
লাজুক মেয়ে
বাড়ির পেছনে বাঁশপাতা নামানোর সময় দৌড়ে আসে নীলার মেয়ে সঞ্চিতা মুরমু। মা-মেয়ে জড়িয়ে ধরে। নীলা আদর করে সঞ্চিতার চুলে বিলি কাটেন। কিন্তু মেয়েটি অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলে না, শুধু মুচকি হাসে। নীলা বলেন, মেয়েটি খুব লাজুক। প্রথম দিন তো অচেনা মানুষের সঙ্গে কথা বলবে না। কোনো উৎসবে আবার আসতে বললেন তিনি।



