রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে চলছে লোকশিল্পভিত্তিক প্রদর্শনী ‘ধারণ’। ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী চলবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত (শুক্রবার বিকাল ৩টা থেকে) এই আয়োজন সবার জন্য উন্মুক্ত।
প্রদর্শনীর কিউরেটর ও লক্ষ্য
প্রদর্শনীর কিউরেটর হিসেবে রয়েছেন জিন্নাতুন জান্নাত এবং সহ-কিউরেটর আয়শা নাজমিন। জিন্নাতুন জান্নাত জানান, লোকজ ও গ্রামীণ শিল্পচর্চাকে আধুনিক শিল্পের তুলনায় নিম্নস্তরের হিসেবে দেখার যে প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে একাডেমিক ও শিল্পবাজারে প্রতিষ্ঠিত ছিল, ‘ধারণ’ সেই ধারণাকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়। তার মতে, লোকশিল্প নিজস্ব ভাষা ও নান্দনিকতায় একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পধারা, যা সমকালীন শিল্পচর্চার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
প্রদর্শনীর লক্ষ্য শিল্পী ও দর্শক, গ্রাম ও শহর, এবং অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি অর্থবহ সংলাপ তৈরি করা। আয়োজকরা বলছেন, লোকশিল্পকে কেবল ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমকালীন প্রেক্ষাপটে পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বিবেচনার মধ্য দিয়ে এর শিল্পমূল্যকে তুলে ধরা হচ্ছে।
প্রদর্শনীর শিল্পধারা
প্রদর্শনীতে নকশিকাঁথা, বাঁশশিল্প, পটচিত্র, মাটির পুতুল ও রিকশাচিত্র—এই পাঁচটি ভিন্ন লোকশিল্পধারাকে একত্র করা হয়েছে। এসব শিল্পধারা তাদের নিজস্ব উপকরণ, অভিজ্ঞতা ও বর্ণনাভঙ্গির মাধ্যমে একটি বহুমাত্রিক শিল্পজগৎ নির্মাণ করেছে, যা বাংলাদেশের শিল্প বৈচিত্র্যকে বিশ্বমঞ্চে স্বতন্ত্র করে তোলে।
আয়োজকদের ভাষ্য, কৃষিজীবী সমাজের শিল্পীরা ঐতিহ্যগতভাবে সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমসাময়িক ও প্রযুক্তিনির্ভর উপকরণও যুক্ত হয়েছে। ফলে লোকশিল্প হয়ে উঠেছে জীবনঘনিষ্ঠ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং পরিবর্তনশীল এক সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ।
জুলাই আন্দোলনের প্রভাব
প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া রিকশাচিত্র, বাঁশশিল্প ও নকশিকাঁথার কাজগুলো বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিভিন্ন কর্মশালা থেকে নির্বাচিত। এসব কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে ঐতিহ্যের সংযোগকে নতুন মাত্রা দিয়েছে বলে জানান আয়োজকরা। এছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তৈরি কিছু নকশিকাঁথা ও রিকশাচিত্রে শিল্পীদের ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে প্রতিবাদের ভাষা যুক্ত হয়েছে। এতে স্মৃতি, পরিচয় ও প্রতিরোধের প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে এসেছে, যা লোকশিল্পকে সমকালীন বাস্তবতার সক্রিয় ভাষ্যে পরিণত করেছে।
মাটির পুতুল সংগ্রহ
প্রদর্শনীতে থাকা মাটির পুতুলগুলো সংগ্রাহক ইমরান-উজ-জামানের কাছ থেকে সংগৃহীত। বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা এসব পুতুলে আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, গল্প, শৈলী ও নান্দনিকতার ভিন্নতা প্রতিফলিত হয়েছে।
সাংস্কৃতিক অবস্থান
আয়োজকদের মতে, ‘ধারণ’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; এটি ঐতিহ্যকে নতুনভাবে উপলব্ধি, সংরক্ষণ ও উপস্থাপনের একটি সচেতন সাংস্কৃতিক অবস্থান।



