কুমিল্লা অঞ্চলে জনশক্তি রপ্তানির সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও করণীয় শীর্ষক এক গোলটেবিল সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১১ এপ্রিল কুমিল্লার বুরো বাংলাদেশ ট্রেইনিং সেন্টারে এই সংলাপে অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। সংলাপে প্রবাসীদের অবদান, বিদেশগামী কর্মীদের সমস্যা এবং এসব সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রবাসীদের অবদান ও চ্যালেঞ্জ
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা বলেন, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেকে দেশে কিছু করতে না পেরে বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এ ক্ষেত্রে কিছু অসাধু এজেন্সি তাদের নানা প্রলোভন দেখিয়ে সর্বস্ব নিয়ে নেয়, অথচ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের বিদেশে পাঠায় না। কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নিয়ে টাকা জোগাড় করেন, কিন্তু প্রতারিত হন। তাদের মধ্যে যারা বিদেশে যান, তাদের অনেকেই প্রত্যাশিত কাজ বা বেতন পান না, নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হন।
তিনি আরও বলেন, আমরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে এ ধরনের বহু অভিযোগ পাই এবং ওই মধ্যস্থতাকারীদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে হয়, যাতে তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয় বা টাকা ফেরত দেয়। এই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের জন্য শুধু আইন করলেই হবে না, আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কুমিল্লা অঞ্চল থেকে বিদেশগামী বা প্রবাসী মানুষদের ঘিরে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আজ একজন প্রবাসফেরত ব্যক্তির কষ্টের কথা জানা গেল। এ রকম অসংখ্য অভিজ্ঞতা অজানাই থেকে যায়। আরও বেশি মানুষের অভিজ্ঞতা জানা গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতো। বিশেষ করে বিদেশে যেতে একজন মানুষের প্রকৃত খরচ কত, নানা জটিলতার কারণে তা অনেক সময় প্রকাশ পায় না।
তিনি আরও বলেন, আজকের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত আছেন। এখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত এলে তা অভিবাসনপ্রক্রিয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমাদের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে এবং এই ওয়ান স্টপ সার্ভিসটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে প্রতারণার সুযোগ কমে আসবে।
দালাল প্রতিরোধে করণীয়
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাইফুল মালিক বলেন, প্রবাসীদের নানা সমস্যার পেছনে বড় কারণ অজ্ঞতা ও দক্ষতার অভাব। অনেকেই পর্যাপ্ত তথ্য ও প্রস্তুতি ছাড়াই বিদেশে গিয়ে জটিলতায় পড়ছেন। এ বিষয়ে প্রচার বাড়ানো এবং নীতিনির্ধারণে তৃণমূলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে সমস্যাগুলো অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বিদেশগামীদের নিবন্ধনপ্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। নিবন্ধনের পর প্রশিক্ষণ, চুক্তিপত্র ও ব্যাংক হিসাব যাচাই করে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া উচিত।
সমন্বিত ডেটাবেজের অভাব
সহকারী পরিচালক মো. আতিকুর রহমান বলেন, কুমিল্লায় জেলা অভিবাসন সমন্বয় কমিটি ও জনশক্তি-সংক্রান্ত সভাগুলো নিয়মিতভাবে হয়, যেখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, এনজিও ও অংশীজন অংশ নেয়। এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেবাগুলো এক জায়গায় আনার সুযোগ নেই; নিজস্ব ভবন, যানবাহন ও পর্যাপ্ত প্রচার বাজেটের ঘাটতি মাঠপর্যায়ের কাজকে বাধাগ্রস্ত করে।
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী কর্মী, বিশেষ করে নারী কর্মীদের জন্য মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং সেবা নেই বললেই চলে। জেলা পর্যায়ে বিশেষজ্ঞ কাউন্সেলরের মাধ্যমে এ সেবা চালু করা প্রয়োজন।
সুপারিশ
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ উপস্থাপন করেন:
- সমন্বয় সভা: জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে নিয়মিত (মাসিক) সমন্বয় সভা ও অগ্রগতি ট্র্যাকিং প্রাতিষ্ঠানিক করা।
- তথ্য কেন্দ্র: ইউনিয়ন পর্যায়ে অভিবাসন তথ্য ও অভিযোগ সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন করে স্থানীয় পর্যায়ে সেবা ও সমন্বয় জোরদার করা।
- ওয়ান স্টপ সার্ভিস: বিএমইটির নেতৃত্বে জেলা পর্যায়ে সমন্বিত সার্ভিস ডে বা ওয়ান-স্টপ সেবা ব্যবস্থা চালু করা।
- একীভূত ডেটাবেজ: প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একীভূত অভিবাসন ডেটাবেজ তৈরি ও কার্যকর করা।
- অভিযোগ নিষ্পত্তি: জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে সহজপ্রাপ্য অভিযোগ নিষ্পত্তি ও সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা।
- সচেতনতা: জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে লক্ষ্যভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা।
সংলাপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন মো. ইউসুফ মোল্লা, মো. সাইফুল ইসলাম, সাইফুল মালিক, মো. আতিকুর রহমান, ক্যাথরিন সিসিল, বদরুল হুদা, কামরুজ্জামান, মো. ইসহাক, রওনক জাহান, মো. মাইন উদ্দিন, ইকবাল মাহমুদ, মেরিনা সুলতানা, জেসিয়া খাতুন, ফারজানা আলম মজুমদার ও ফাতেমা আক্তার। সঞ্চালনা করেন ফিরোজ চৌধুরী।



