ভারত মহাসাগরে মার্কিন হামলা: ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবি ও ভারতের কৌশলগত সংকট
ভারত মহাসাগরে মার্কিন হামলা: ইরানি জাহাজ ডুবি ও ভারতের সংকট

ভারত মহাসাগরে মার্কিন হামলা: ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবি ও ভারতের কৌশলগত সংকট

গত অক্টোবরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতীয় নৌসেনাদের এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, 'ভারতীয় নৌবাহিনী হলো ভারত মহাসাগরের অভিভাবক।' কিন্তু মাত্র পাঁচ মাস পর, সেই অভিভাবকত্বের দাবি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। গত বুধবার, ভারতের আমন্ত্রণে নৌ-মহড়া 'মিলন'-এ অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পথে ইরানি যুদ্ধজাহাজ 'আইআরআইএস ডেনা' মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলার শিকার হয়ে শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলের কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় তলিয়ে যায়। এই ঘটনায় ৮০ জনের বেশি ইরানি নাবিক নিহত হয়েছেন, যারা মহড়ায় অংশ নিয়ে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে সেলফি তুলেছিলেন।

ঘটনার বিবরণ ও ভারতের প্রতিক্রিয়া

জাহাজটি আক্রান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে ভারতীয় নৌবাহিনীর এক দিনের বেশি সময় লেগেছে। তারা জানায়, বিপদসংকেত পাওয়ার পর সাহায্যের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ততক্ষণে শ্রীলঙ্কা উদ্ধারকাজ শুরু করে দিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই হামলার দায় স্বীকার করে বলেন, 'একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডুবিয়েছে। তারা হয়তো ভেবেছিল, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তারা নিরাপদ থাকবে।' ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'ইরানের উপকূল থেকে ২ হাজার মাইল দূরে সমুদ্রের বুকে যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ নৃশংসতা চালিয়েছে। একদিন তাদের অবশ্যই এর জন্য পস্তাতে হবে।'

ভারতের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন

এই হামলা ভারতের শক্তি ও প্রভাবের সীমাবদ্ধতাকে প্রকাশ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ভারতের অবসরপ্রাপ্ত নৌ-কর্মকর্তা ভাইস অ্যাডমিরাল শেখর সিনহা বলেন, 'ভারত মহাসাগরকে আগে নিরাপদ মনে করা হতো। কিন্তু এখন আমরা বুঝতে পারছি, পরিস্থিতি বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরানের এই সংঘাত এখন ভারতের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছে।' সাবেক নৌবাহিনীপ্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ প্রশ্ন তোলেন, 'ভারত যদি আগে থেকে এই হামলার বিষয়ে জানত, তবে এটি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতে ভারতের অবস্থান প্রমাণ করে। আর যদি না জানত, তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের কৌশলগত অংশীদারিত্বের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।'

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব

বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেন, মোদি সরকার 'ভারতের কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থকে' বিসর্জন দিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষক শ্রীনাথ রাঘবন মনে করেন, ভারত পরোক্ষভাবে আগ্রাসীদের পাশে অবস্থান নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান 'সোসাইটি ফর পলিসি স্টাডিজ'-এর পরিচালক সি উদয় ভাস্কর বলেন, 'সরকারের নীরবতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভারতের নৈতিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এটি ভারতের জন্য কৌশলগত অস্বস্তি।'

এই ঘটনা শুধু একটি যুদ্ধজাহাজের ডুবি নয়, বরং ভারত মহাসাগরে ভারতের ভাবমূর্তি ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও বৈদেশিক নীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।