গোপন বাণিজ্য চুক্তির কারণে ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে: বাসদ নেতার অভিযোগ
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ একটি গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার তাদের মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে এসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি গোপন বাণিজ্য চুক্তি করেছে। এই চুক্তির ফলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে ৪২ হাজার কোটি টাকার মার্কিন কৃষিপণ্য আমদানি করতে হবে। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই পদক্ষেপ দেশের কৃষি খাত এবং কৃষকদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
নতুন সরকারের প্রতি দাবি
বজলুর রশিদ ফিরোজ গত ৫৫ বছরে ভারত, আমেরিকা ও জাপানের সাথে হওয়া সমস্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য নতুন সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৮ মাসের কার্যক্রম নিয়ে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশেরও আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা: প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এই সভার আয়োজন করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিষদ।
গণতন্ত্র ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মন্তব্য
বজলুর রশিদ ফিরোজ তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, শুধু নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়। তিনি উদাহরণ হিসেবে হিটলার ও মুসোলিনির কথা টেনে এনে বলেন, তারা নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসে ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল। তার মতে, নির্বাচিত সরকার কতটুকু গণতান্ত্রিক, তা নির্ভর করে জনগণের ক্ষমতায়ন ও মৌলিক অধিকার রক্ষার উপর।
ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ‘দাসখত’ দিয়ে তাদের দাসত্ব স্বীকার করেছিলেন। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব নয়, তাই সমমর্যাদা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
বিদ্যুৎ চুক্তি ও জল সম্পদ নিয়ে উদ্বেগ
তিনি অভিযোগ করেন, ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দিলেও আদানির সাথে হওয়া জাতীয় স্বার্থবিরোধী ভয়াবহ বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। এছাড়া, ২০২৬ সালে গঙ্গার পানি চুক্তির নবায়ন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাচন সংস্কার ও দুর্নীতি তদন্তের দাবি
নির্বাচন প্রসঙ্গে বজলুর রশিদ বলেন, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৩৬ জনই কোটিপতি। এটি কার্যত একটি কোটিপতিদের ক্লাবে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা কঠিন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন যেসব প্রস্তাব দিয়েছিল, তার একটিও মানা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তের দাবি করে তিনি বলেন, ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি এবং আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে ১৪ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, নতুন সরকারের উচিত তা তদন্ত করা। এছাড়া, শেখ হাসিনার বিচার ছাড়া অন্য কারো বিচার তেমনভাবে এগোয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের মধ্যে সিন্ডিকেট ও রাজসাক্ষী কেনাবেচার অভিযোগেরও তদন্ত দাবি করেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের আহতদের জন্য আহ্বান
জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, অনেক আহত মানুষ এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন, অথচ সরকার তাদের যথাযথ দায়িত্ব নেয়নি। পুকুরভিত্তিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে ২ কোটি মানুষের ভাগ্য বদলের পরিকল্পনা করার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সভায় অন্যান্য বক্তারা
আয়োজক সংগঠনের সভাপতি শেখ আবদুন নূরের সভাপতিত্বে এই সভায় আরও বক্তৃতা করেন সাংবাদিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব সোহরাব হাসান, মনজুরুল ইসলাম, আশরাফ কায়সার, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক প্রমুখ।
