পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতার সহায়ক খুন, তদন্তে সিআইডি
পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতার সহায়ক খুন, তদন্তে সিআইডি

জনবহুল এলাকায় গুলিবৃষ্টি। পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ঝাঁঝরা করে দেওয়া হলো পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথকে। বুধবার রাতের এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার সকালেও থমথমে কলকাতার লাগোয়া মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়া এলাকা। ঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যেই নেমেছে সিআইডি-র হোমিসাইড শাখা এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। উদ্ধার হয়েছে নম্বরবিহীন চুরির গাড়ি। এই খুনের পিছনে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং পেশাদার সুপারি কিলারদের হাত রয়েছে বলে প্রাথমিক অনুমান তদন্তকারীদের।

ঘটনার বিবরণ

বুধবার রাত ১০টা থেকে ১০.২০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাটি ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী সুশান্ত সরকার যুগশঙ্খকে জানান, আমি তখন রাস্তার কুকুরগুলোকে খেতে দিচ্ছিলাম। আচমকাই চিৎকার শুনতে পাই। এক ব্যক্তি চিৎকার করতে করতে যাচ্ছিল যে গুলি চালিয়ে দিয়েছে। গিয়ে দেখি একটি স্করপিও গাড়ির ভেতর মুখ গুঁজে পড়ে রয়েছেন একজন। সামনের দিকে একটি নম্বরবিহীন অল্টো গাড়ি দাঁড়ানো ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ঘটনাস্থলে তিনি তিনটি গুলির খোল পড়ে থাকতে দেখেন। ওই নম্বরবিহীন গাড়িটি দিয়েই চন্দ্রনাথের পথ আটকানো হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।

সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

তদন্তে জানা গিয়েছে, এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বা ‘প্রি-প্ল্যান্ড মার্ডার’। খুনিরা আগে থেকেই এলাকা রেইকি করেছিল। সরু গলির মধ্যে একটি অল্টো গাড়ি দিয়ে প্রথমে চন্দ্রনাথের স্করপিওটির গতি রুদ্ধ করা হয়। গাড়িটি থামতেই পিছন থেকে বাইকে করে আসা দুষ্কৃতীরা পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে এলোপাথাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে। ৯ এমএম পিস্তল ব্যবহার করে চন্দ্রনাথের শরীর ঝাঁঝরা করে দেওয়া হয়। গাড়িতে থাকা তিনজনের মধ্যে একজনের মাথায় গুলি লাগে, চালকও আহত হন, তবে অন্যজন মাথা নিচু করে প্রাণে বাঁচেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিজেপি নেতা অর্জুন সিং সরাসরি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাঁর দাবি, এটি এজেন্সির থেকে শিখে আসা ট্রেন্ড কিলারের কাজ। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক ঘনিষ্ঠ অফিসার খুনের মাস্টার। সম্ভবত বাংলাদেশ থেকে লোক ভাড়া করে এই কাজ করানো হয়েছে। একই সুর শোনা গিয়েছে শঙ্কুদেব পণ্ডার গলায়। তিনি বলেন, নির্বাচনে হারের পরও এদের শিক্ষা হয়নি। এটি একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড।

পুলিশের তদন্ত

রাজ্যের পুলিশ প্রধান সিদ্ধনাথ জানিয়েছেন, অপরাধে ব্যবহৃত অল্টো গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। গাড়িটির নম্বরপ্লেট শিলিগুড়ির হলেও সেটি আসলে ভুয়ো এবং গাড়িটি চুরির। বৃহস্পতিবার সকালে সিআইডি-র হোমিসাইড শাখা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা গাড়ির সিটে লেগে থাকা রক্তের দাগ এবং গাড়ির বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। বারাসাত মেডিক্যাল কলেজে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ টিম গঠন করা হয়েছে ময়নাতদন্তের জন্য। এই টিমে একজন বিভাগীয় প্রধান এবং দু’জন সহকারী অধ্যাপক রয়েছেন। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক রিপোর্ট পাওয়ার পরই এফআইআর রুজু করা হবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বর্তমানে চণ্ডীপুরের বাসিন্দা চন্দ্রনাথের বসত এলাকা দোহাড়িয়া থেকে যশোর রোড পর্যন্ত পুরো রাস্তা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে মুড়ে ফেলা হয়েছে। যাতায়াতে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দোষীদের ধরতে চিরুনি তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তবে ঘটনার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও এখনও পর্যন্ত কেউ গ্রেফতার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে গেরুয়া শিবির।

আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নের মুখে

পেশাদার সুপারি কিলারদের নিখুঁত নিশানায় যেভাবে এক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠকে সরিয়ে দেওয়া হলো, তা রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সিআইডি তদন্তে কোনও ‘প্রভাবশালী’র নাম উঠে আসে।