প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা ও সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বলেছেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সুদৃঢ় সিভিল-মিলিটারি সম্পর্ক দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। মঙ্গলবার (৫ মে) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬ এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ বিষয়ক অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কের গুরুত্ব
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে এই সম্পর্কের গভীর শিকড় নিহিত। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘোষণার মাধ্যমেই স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা জনগণের বাহিনী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, একটি আধুনিক ও নিরাপদ বাংলাদেশ গঠনে জাতীয় নিরাপত্তা, সুশাসন এবং কার্যকর প্রশাসনিক সমন্বয় অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে দেশের সকল বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আশরাফ উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা
বক্তব্যের শুরুতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ উৎসর্গকারী সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং জুলাই আন্দোলনে নিহত ছাত্র-জনতাকেও স্মরণ করেন।
সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা
শামছুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী প্রকৃত অর্থেই জনমানুষের বাহিনী। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগে দ্রুত সহায়তা প্রদান করে তারা জনগণের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীল সময়ে সশস্ত্র বাহিনী মাসের পর মাস দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিরলসভাবে কাজ করেছে। সুপ্রিম কোর্ট, সচিবালয়, ব্যাংক, বিমানবন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সার্বক্ষণিক উপস্থিতি বজায় রেখে তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জননিরাপত্তা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
চ্যালেঞ্জ ও অপপ্রচার
উপদেষ্টা বলেন, কিছু অসাধু গোষ্ঠী নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে সামরিক বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে এবং সিভিল-মিলিটারি সম্পর্কে ফাটল ধরাতে চেয়েছে। কিন্তু জনগণের আস্থা ও সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্বের কারণে সেই অপচেষ্টা সফল হয়নি। তিনি স্পষ্ট করেন, কোনো ব্যক্তি সামরিক বাহিনীর বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে অপরাধে জড়ালে তার দায় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর নয়। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী রাষ্ট্র ও সংবিধানের প্রতি সর্বদা অনুগত ছিল, আছে এবং থাকবে।
বহুমাত্রিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় নিরাপত্তার বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা সম্ভব নয়। আজ নিরাপত্তা কেবল ভৌগলিক সীমান্ত রক্ষায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সাইবার হামলা, সন্ত্রাসবাদ, জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, তথ্যযুদ্ধ, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো হুমকিও অন্তর্ভুক্ত। তিনি ‘Whole of Government Approach’ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও দুর্নীতি বিরোধী নীতি
সরকার এমন একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যা ‘Credible Deterrence’ নিশ্চিত করবে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে কর্মক্ষেত্রে গতি ও দক্ষতা প্রদর্শনের জন্য তিনি জেলা প্রশাসকদের প্রতি আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের দুর্নীতি বিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি ডিসিদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘যদি নিজের স্বার্থ, দুর্নীতি এবং অপকর্মের সাথে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন, তবে আপনারা আমাদের সহযাত্রী হতে পারবেন না।’
ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের আহ্বান
সবশেষে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মূল দর্শন— ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি ধারণ করে একটি বিভাজনমুক্ত, ঐক্যবদ্ধ ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকার যেভাবে বাহিনীগুলোকে ধ্বংস করেছে, আমরা তার উল্টো পথে হাঁটব। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ‘Citizens in Uniform’ হিসাবে উল্লেখ করে তিনি তাদের যথাযথ মর্যাদা প্রদানের ওপর জোর দেন।



