মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনার জন্য তেহরানের দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবে সন্তুষ্ট নন। গতকাল শুক্রবার ট্রাম্প নিজেই তাঁর এ অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে, তাহলে তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার জন্য প্রস্তুত।
অচলাবস্থা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা
ট্রাম্পের মন্তব্য ইঙ্গিত করছে, প্রায় দুই মাস আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ নিয়ে অচলাবস্থা সম্ভবত শিগগিরই কাটবে না, যদিও তিনি এমন একটি সংঘাতের অবসান ঘটাতে চাইছেন, যা মার্কিনদের মধ্যে গভীরভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির ঐতিহ্যগত মিত্রদের সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র এদিন জার্মানি থেকে তাদের পাঁচ হাজার সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে ট্রাম্প আগে থেকেই সেনা কমানোর হুমকি দিয়েছিলেন। মের্ৎস গত সোমবার বলেছিলেন, ইরানিরা যুক্তরাষ্ট্রকে অপমান করছে এবং মার্কিনদের হাতে (এ যুদ্ধ থেকে) বের হয়ে আসার কোনো কৌশল নেই।
পেন্টাগনের প্রতিক্রিয়া
পেন্টাগনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, সম্প্রতি জার্মানি যেসব মন্তব্য করেছে, সেগুলো ‘অনুপযুক্ত এবং কোনো কাজের নয়’। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘উল্টো কাজ করা এসব অপ্রয়োজনীয় মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন।’
বিরোধের মূল বিষয়গুলো
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর থেকে সাময়িকভাবে শত্রুতা স্থগিত রেখেছে, তবু দুই দেশের মধ্যে এখনো একাধিক বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ।
এ ছাড়া শান্তি ফেরাতে গত মাসে ইসলামাবাদে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সংক্ষিপ্ত বৈঠকের পর পরবর্তী কোনো বৈঠকের বিষয়ে দুপক্ষ এখনো একমত হতে পারেনি। ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টা ধরে চলা ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে।
ইরানের প্রস্তাব ও ট্রাম্পের অবস্থান
ইরানের নতুন প্রস্তাবে কী আছে, তা স্পষ্ট নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত কোনো ফলাফল প্রত্যাশা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে। এরপর হোয়াইট হাউসে শুক্রবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘তারা একটি চুক্তি করতে চায়, কিন্তু…আমি এতে সন্তুষ্ট নই।’ ইরানের নেতৃত্ব ‘খুবই বিভক্ত’ এবং তারা দুই বা তিনটি দলে ভাগ হয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তারা এমন কিছু দাবি করছে, যা আমি মানতে পারি না। ফোনে আলোচনা এখনো চলমান বলেও জানান ট্রাম্প। শুক্রবার রাতে ফ্লোরিডায় এক বক্তৃতায় ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এই সংঘাত দ্রুত শেষ করবে না, যাতে ‘তিন বছর পরে আবার একই সমস্যা দেখা না দেয়’। তিনি আবারও বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে পাওয়ার অনুমতি দেওয়া হবে না।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ ভাঙা নিয়ে চাপে রয়েছেন ট্রাম্প। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের প্রস্তাবের খবর জানাজানির পর শুক্রবার বিশ্বব্যাপী তেলের দাম কিছুটা কমেছে। আগের দিন বৃহস্পতিবার গত চার বছরের মধ্যে তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাঁর টেলিগ্রাম চ্যানেলে এক পোস্টে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি তাদের ‘অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান, হুমকিমূলক বক্তব্য এবং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ পরিবর্তন করে, তাহলে ইরান কূটনৈতিক আলোচনায় যেতে প্রস্তুত। ‘তবে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করতেও প্রস্তুত রয়েছে’—যোগ করেন আরাগচি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুজন জ্যেষ্ঠ ইরানি সূত্র রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সক্রিয় করেছে এবং হামলা হলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার পরিকল্পনা করছে। কারণ, তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র স্বল্প সময়ের জন্য তীব্র আক্রমণ চালাতে পারে। এরপর ইসরায়েলও হামলা চালাতে পারে।



