ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতি নদী (আন্তঃসীমান্ত নদী) থেকে ১১ দিন আগে উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। লাশটি আফগানিস্তানের নাগরিক হাশমত মোহাম্মাদির বলে জানিয়েছে তার পরিবার। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান। সর্বশেষ শুক্রবার বেলা ৩টার দিকে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নিহত হাশমতের পরিবার মহেশপুর থানায় অবস্থান করছে। এর আগে সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি দেখে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাশমতের আমেরিকা প্রবাসী ভাই মোহাম্মাদ ইরি।
মরদেহ উদ্ধার ও প্রাথমিক তদন্ত
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ এপ্রিল মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতি নদীতে একটি মরদেহ ভেসে থাকতে দেখে স্থানীয়রা বিজিবি ক্যাম্প ও মহেশপুর থানায় খবর দেয়। পুলিশ মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠায়। পুলিশ ও পিবিআই মরদেহের পরিচয় সনাক্তের জন্য আঙ্গুলের ছাপ নিয়ে জাতীয় পরিচয় পত্র খোঁজার চেষ্টা করে কিন্তু কোথাও ম্যাচ না করায় শেষ পর্যন্ত লাশটি বেওয়ারিশ হয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী লাশটি দাফনের জন্য ঝিনাইদহ আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংস্থাটি ১৪ এপ্রিল লাশটি দাফন করে।
পরিচয় শনাক্তকরণের প্রক্রিয়া
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাওয়া লাশের ছবি দেখে নিহত হাশমত মোহাম্মাদির ভাই আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মাদ ইরা তার ভাইয়ের পরিচয় শনাক্ত করে। এসময় তিনি আমেরিকায় তার পরিচিত বাংলাদেশের বগুড়ার সন্তান আহসানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। আহসান মরদেহের অবস্থান সঠিকভাবে শনাক্ত না করতে পারলেও এটি যশোরের চৌগাছা সীমান্ত হতে পারে বলে অনুমান করে। সেই হিসেবে তিনি ইন্টারনেট ব্যবহার করে চৌগাছা হাসপাতালের ডাক্তার সাইদুর রহমান ইমনের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ডা. ইমন তাকে এক গণমাধ্যম কর্মীর নম্বর দিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে আহসান ও তার মাধ্যমে নিহতের আমেরিকা প্রবাসী ভাই মোহাম্মদ ইরা চৌগাছার সাংবাদিক রহিদুলের সঙ্গে কথা বলেন।
নিহতের ভাইয়ের বক্তব্য
নিহতের ভাই সাংবাদিককে জানান, তার ভাই হাশমত সর্বশেষ ইটালিতে বসবাস করতো। সে ইটালির পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে যাতায়াত করতো। সেখান থেকে বিভিন্ন আংটির পাথর ও রত্ন নিয়ে এসে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্রি করতো। গত পাঁচ বছর আগে তার ভারতীয় কয়েকজন পার্টনারের সঙ্গে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মারামারি হয়। এই ঘটনায় মামলা হলে ভারতীয় পুলিশ অন্যদের সঙ্গে হাশমতকেও গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘ পাঁচ বছর মামলা চলার পর ভারতীয় আদালত হাশমতকে বেকসুর খালাস দেন কিন্তু দেশে ফেরার কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। তাই সে জেল থেকে বের হয়ে ইটালি ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। এসময় তার সঙ্গে মাসুদ (পরিচয় নিশ্চিত নয়) নামে এক বাংলাদেশির সঙ্গে পরিচয় হয়। মাসুদ তাকে পরামর্শ দেয় ভারতীয় সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে গেলে সেখান থেকে সে ইটালি চলে যেতে পারবে। মাসুদের সঙ্গে সে গত ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। পরে ১১-১২ এপ্রিলের দিকে সে তার আমেরিকা প্রবাসী ভাইকে ইরাকে ফোন করে জানায়, সামনে একটা নদী (ইছামতি) এটা পার হলেই তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এবং নিরাপদ হয়ে যাবে। এসময় কথিত মাসুদের সঙ্গেও তাদের কথা হয়। মোহাম্মদ ইরা আরও জানান, এরপর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারা এসময় মাসুদের ফোনও বন্ধ পায়।
কয়েকদিন পর মাসুদের সঙ্গে তার একবার কথা হয় মাসুদ তাকে জানায় আপনার ভাই মারা গেছে বাংলাদেশে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এসময় মাসুদ তার মোবাইল ফোন থেকে দুটি ছবিও পাঠায়। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি। সর্বশেষ ২২ এপ্রিল বাংলাদেশি আহসানের মাধ্যমে নিহত হাশমতের ভাই ইরা চৌগাছার সাংবাদিকদের সহযোগিতায় মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতানের সঙ্গে কথা বলে মরদেহটি তার ভাইয়ের বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত করে। মোহাম্মদ ইরা জানান, তার আরও এক ভাই লন্ডন প্রবাসী বর্তমানে বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য ভিসাসহ অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত করছে।
পুলিশের বক্তব্য
মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান বলেন, মরদেহটি সুরতহাল প্রস্তুত করার সময়ই মনে হয়েছিল এটি কোনো বিদেশি হতে পারে। নিহতের ভাই ও ভাবী আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। এই বিষয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মহেশপুর থানার এসআই টিপু সুলতান বলেন, ভিকটিমের ভাই আমেরিকা প্রবাসী মোহাম্মদ ইরার সঙ্গে কথা হয়েছে। মাসুদের মোবাইল নম্বর পেয়েছি তদন্ত শুরু করেছি। দেখি কতদূর যাওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, সুরতহাল করার সময় মরদেহের গায়ে আঘাতের কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। এই জন্য ঠিক কী কারণে তার মৃত্যু হয়েছে সেটা জানার জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।



