পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় ভোটের রেকর্ড ৯১.৫২%, সহিংসতার অভিযোগ
পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফায় ভোটের রেকর্ড ৯১.৫২%

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার প্রথম ধাপের নির্বাচনে প্রায় ৯২ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। আনন্দবাজার পত্রিকার এক খবরে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত রাজ্যে ভোটের হার ছিল ৯১.৫২ শতাংশ। যা ভারতে এ যাবত্কালে সর্বোচ্চ ভোট পড়ার রেকর্ড হতে পারে। এদিকে ভোটের দিনে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষিপ্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গাড়ি ভাঙচুর, প্রার্থীকে মারধর করার অভিযোগ উঠেছে। এমনকি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপরও হামলার অভিযোগ উঠেছে।

প্রথম দফার ভোট শেষে প্রতিক্রিয়া

প্রথম দফার ভোট শেষ হওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী তথা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, এবার প্রচুর ভোট পড়েছে। এটা গুড সাইন। সবাই এসআইআর নিয়ে ভীত ছিলেন। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা অমিত শাহ বলেছেন, তৃণমূলের দুর্নীতি এবং গুন্ডারাজের সূর্য অস্ত গেছে। প্রসঙ্গত, প্রথম দফায় ১৫২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ১ হাজার ৪৭৮ জন প্রার্থী। এই দফায় ভাগ্য নির্ধারণ হবে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী মানস ভূইয়া, বিরোধী নেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং জাতীয় কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরির মতো হেভিওয়েট প্রার্থীদের। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে এই ১৫২টি আসনের মধ্যে ৯২টিতে জয় পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পেয়েছিল ৫৯টি আসন এবং একটি আসন জিতেছিল স্বতন্ত্র্য প্রার্থী। সে সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) কোনো আসন পায়নি। এবার মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর—এই তিন মুসলিম অধ্যুষিত জেলায় মোট ৪৩টি আসনে সংখ্যালঘু ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৯ এপ্রিল। সব দফার ভোট গণনা হবে ৪ মে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভোট পড়ার রেকর্ড

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফায় গতকাল ১৬ জেলায় সকাল ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়। ভোটগ্রহণ চলে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। কয়েক ঘণ্টা পরপর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ভোট পড়ার হার জানানো হয়। সর্বশেষ ৬টার পর জানানো হয়, মোট ভোট পড়েছে ৯১ দশমিক ৫২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় ৯৩.১২ শতাংশ। এরপরেই আছে কুচবিহার জেলা। সেখানেও ৯২ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। যে ১৫২টি বিধানসভা আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে, সেগুলোতে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোট পড়েছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। প্রায় তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন দেখছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বিশ্বজিত্ ভট্টাচার্য। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, এত বছর ধরে ভোট দেখছি, সব সময়েই দেখেছি যে গরমের কারণে হয় খুব সকালে, নয়তো রোদ পড়ে আসার পরে ভোটারদের লাইন বড় হতে থাকে। কিন্তু এবার দেখছি সকাল থেকেই ভোট দানের হার বেড়ে চলেছে। যেসব অঞ্চলে ভোটের দিনে অস্থিরতার আশঙ্কা ছিল, সেখানে এবার বিশৃঙ্খলা তেমন হয়নি। তিনি বলেন, সামান্য হাতাহাতি, ধাওয়া করা, কয়েকটা বোম পড়া—এসব তো একেবারেই তুচ্ছ। এর একটা অর্থ হচ্ছে, মানুষ এবার ভোটটা দিতেই হবে—এটা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। এসআইআর নিয়ে যা হয়েছে, তারপরে ভোটার তালিকায় নাম থাকা কেউ আর ঝুঁকি নিতে চাইছেন না বলেই মনে হচ্ছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষকদের বিশ্লেষণ

কলকাতার সমাজ-গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সবর ইনস্টিটিউট’ এর গবেষক সাবির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, মুর্শিদাবাদ জেলার মুসলমান অধ্যুষিত আসনগুলোতে প্রচুর সংখ্যক ভোট পড়েছে দেখা যাচ্ছে। অথচ আমরা বিগত নির্বাচনগুলোয়, এমনকি ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও দেখেছি যে, ঐ অঞ্চলে নারীদের ভোটদানের হার বেশি ছিল পুরুষদের তুলনায়। এর একটা কারণ হলো—বড় সংখ্যক পুরুষ তো পরিযায়ী শ্রমিক। তাদের মধ্যে বহু মানুষ ভোট দিতে বাড়িতে আসেনই না। এবারে নারী আর পুরুষদের ভোটদানের হার যদিও এখনো প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন, তবে এত বেশি ভোটদানের হার দেখে মনে হচ্ছে বহুসংখ্যক পরিযায়ী শ্রমিক পুরুষও ফিরে এসেছেন ভোট দেওয়ার জন্যই। আবার অন্যান্য জেলাতেও দেখা যাচ্ছে যে, সকাল থেকেই ভোটদানের হার বেশিই থেকেছে। আমাদের মনে হচ্ছে, এসআইআর নিয়ে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মানুষের মনে, ভোটদানের এই হার দেখে মনে হচ্ছে, মানুষ এবার নিশ্চিত করতে চাইছেন যাতে তারা ভোট দিতে পারেন। উল্লেখ্য, এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন হলো—ভারতের নির্বাচন কমিশন কর্তৃক পরিচালিত ভোটার তালিকা সংশোধনের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য হলো, ভোটার তালিকা থেকে মৃত বা অযোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়া এবং নতুন যোগ্য নাগরিকদের তালিকাভুক্ত করে একটি ত্রুটিমুক্ত নতুন ভোটার তালিকা প্রস্তুত করা। এই এসআইআর এর কারণে এবার পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন প্রায় ২৭ লাখ ভোটার।

বিক্ষিপ্ত সহিংসতা, হামলা

নির্বাচনের দিন সকাল থেকে একাধিক জায়গায় নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা-অস্থিরতার অভিযোগ এসেছে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেস উভয় দলের তরফ থেকেই। বিভিন্ন জায়গায় হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন বিজেপির প্রার্থীরা। দক্ষিণ দিনাজপুরের কুমারগঞ্জে তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার অভিযোগ করেছেন বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার। আসানসোল দক্ষিণের বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের গাড়িতে ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে তৃণমূল কর্মী সমর্থকদের বিরুদ্ধে। বিজেপি অভিযোগ করেছে, ঐ অঞ্চলের একাধিক ভোটকেন্দ্র থেকে বিজেপির নির্বাচনি এজেন্টদের জোর করে সরিয়ে দিয়েছে তৃণমূল কর্মীরা। দিনের শুরুতে মুর্শিদাবাদের ডোমকল কেন্দ্র্রে সিপিআই (এম) ও তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে চার জন আহত হন। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মীদের সঙ্গে হুমায়ুন কবীরের পার্টি আম জনতা উন্নয়নের কর্মীদের দফায় দফায় সংঘাতের জেরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে মুর্শিদাবাদ জেলার নওদা বিধানসভা ভোট। এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে। উত্তর দিনাজপুরের চোপরায় ১৬৩ নম্বর বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর তিন জন নারীকে হেনস্তা করার অভিযোগ তুলেছে তৃণমূল কংগ্রেস। একই রকম অভিযোগ উঠে এসেছে সোনামুখী বিধানসভা কেন্দ্র থেকে। সেখানে বুথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ সিআরপিএফের বিরুদ্ধে। নির্বাচনের প্রথম দফায় দুপুর ২টা পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী তৃণমূলের পক্ষ থেকে সাতশর বেশি অভিযোগ করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে ভোটারদের হেনস্তা করার অভিযোগ অন্তত ১০০টি।

ক্ষমতায় টিকে থাকা ও ক্ষমতা দখলের লড়াই

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোট শাসক ও বিরোধী—সব পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে এই নির্বাচন ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, তেমনই বিরোধী বিজেপির কাছে ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা। মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস ২০১১ সাল থেকে টানা তিন বার বিধানসভা ভোটে জিতেছে। উপনির্বাচন মিলিয়ে ২০২১ সালে ২১৫টা আসন তাদের দখলে ছিল। গত বিধানসভা ভোটে বিজেপির ঝুলিতে প্রাথমিকভাবে ৭৭টি আসন ছিল। পরবর্তীতে উপনির্বাচনের পর তা কমে ৭৫-এ দাঁড়ায়। অন্যদিকে, বাম দলগুলো বা কংগ্রেসের কেউই বিধানসভায় আসন পায়নি। বিধানসভা নির্বাচনের পরে একাধিক বিজেপি বিধায়ক দলবদল করে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়েছিলেন।

তামিলনাড়ুতেও বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণ

পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি তামিলনাড়ুতেও ভোটগ্রহণ হয়েছে গতকাল। তামিলনাড়ুতে ২৩৪টি আসনে এই একটি দফাতেই ভোট গ্রহণ হয়েছে। এই ভোটে তামিলনাড়ুর চার হাজার ২৩ জন প্রার্থী রয়েছেন। ভোটের ফল জানা যাবে ৪ মে। ২০২১ সালের দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১৫৯টি আসনে জয়লাভ করে রাজ্য সরকার গঠন করে এবং এম কে স্ট্যালিন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাগাম (এআইএডিএমকে) ৬৬টি আসন জিতে প্রধান বিরোধী দল হয়ে ওঠে। এই দলের নেতা এডাপ্পাদি কে. পালানিস্বামী বিরোধী দলের নেতার দায়িত্ব পালন করেন। চলতি বছরের বিধানসভা ভোটে কে জয়ী হন সেই দিকে সকলের নজর রয়েছে।