পাকিস্তানের ইসরায়েল নীতির ওপর ট্রাম্পের চাপ ও ইসলামাবাদের প্রত্যাখ্যান
পাকিস্তানের ইসরায়েল নীতির ওপর ট্রাম্পের চাপ ও প্রত্যাখ্যান

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত হোয়াইট হাউসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎ পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়কে অনুষ্ঠিত হয়, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের জন্য চাপ বাড়াচ্ছে।

পাকিস্তানের ঐতিহাসিক অবস্থান

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানি পাসপোর্টে লেখা রয়েছে, ‘ইসরায়েল ব্যতীত পৃথিবীর সকল দেশের জন্য বৈধ।’ এটি পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন, যা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার নীতি বহন করে আসছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই নীতি জাতীয় ঐকমত্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে একটি ঐতিহাসিক অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আব্রাহাম চুক্তির প্রসঙ্গ

ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য প্রস্তাবিত শান্তিচুক্তির সঙ্গে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র একটি নাটকীয় ও ‘বাধ্যতামূলক’ সম্প্রসারণের শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তি হচ্ছে ২০২০ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের মার্কিন প্রশাসনের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল এবং আরব আমিরাত ও বাহরাইনসহ বেশ কয়েকটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একাধিক চুক্তি। পরবর্তীকালে মরক্কো ও সুদানও এই চুক্তির আওতাভুক্ত হয়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধর্মীয় গোষ্ঠী, মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এ যুদ্ধকে একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে যে একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই অসমর্থনযোগ্য হবে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাকিস্তানের প্রত্যাখ্যান

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার পর ট্রাম্প এক দীর্ঘ পোস্টে দাবি করেন, একটি ঐতিহাসিক আঞ্চলিক বন্দোবস্তকে সুসংহত করতে পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক এবং অন্যদের ‘একযোগে’ এ চুক্তিতে যোগ দেওয়া উচিত। ইসলামাবাদ তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ২৬ মে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ বলেন, পাকিস্তান এমন কোনো ব্যবস্থার অংশ হতে পারে না, যা তার ‘মৌলিক আদর্শের’ সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পাকিস্তান কেন ‘না’ বলছে

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পাকিস্তানের ইসরায়েল–বিষয়ক অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। ইসরায়েলকে স্বীকৃতির ব্যাপারটি সর্বদাই প্রাক্‌-১৯৬৭ সীমান্ত ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শর্তের ওপর নির্ভরশীল ছিল। গত জানুয়ারিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি এক প্রশ্নের জবাবে আব্রাহাম চুক্তিতে ইসলামাবাদের যোগ না দেওয়ার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে কোন দেশ যোগ দেবে বা দেবে না, তা নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই। আমরা বিষয়টি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিবেচনা করি।’

বিশ্লেষকদের মতে, এটা কেবল কূটনৈতিক মামলা নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বারাও এটা গভীরভাবে প্রভাবিত। ইসলামাবাদ-ভিত্তিক একটি থিঙ্ক-ট্যাংকের প্রধান মুহাম্মদ ইসরার মাদানি বলেন, ‘এ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো নয়। এখানে অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ সক্রিয়। জনমত, ইসলামপন্থী, জিহাদি গোষ্ঠী, সংসদ, নাগরিক সমাজ ও প্রাণবন্ত গণমাধ্যম—সবাই পররাষ্ট্রনীতির বিতর্কে প্রভাব রাখে।’

ওয়াশিংটনের চাপ

ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রস্তাবটি ভবিষ্যতের আঞ্চলিক কূটনীতিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের একটি বর্ধিত কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ থেকেই মধ্যপ্রাচ্য কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে আছে আব্রাহাম চুক্তি। এ উদ্যোগের অন্যতম সমর্থক কংগ্রেসে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম যুক্তি দিয়েছেন যে সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তানের উচিত এটাকে সমর্থন করা। তিনি এটাকে ‘এই অঞ্চল ও পৃথিবীর জন্য রূপান্তরকারী শক্তির চেয়েও বেশি কিছু’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

গ্রাহাম ২৪ মে এক পোস্টে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের পরামর্শ অনুযায়ী যদি এই পথে চলতে অস্বীকার করা হয়, তাহলে এটা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে এবং এই শান্তি প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য করে তুলবে। ইতিহাস একে বড় ভুল পদক্ষেপ হিসেবে দেখবে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের এক সংবেদনশীল মুহূর্তে এ বিতর্ক উঠে এল। ইসলামাবাদ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি কূটনৈতিক সেতু হিসেবে কাজ করছে, পাশাপাশি সৌদি আরব ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। অন্যদিকে সিনেটর গ্রাহামের মতো মার্কিন আইনপ্রণেতা ও কয়েকজন বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এমন কঠোর অবস্থান বজায় রেখে পাকিস্তান কীভাবে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করবে?

কিন্তু আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়া পাকিস্তানি নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে। ইসরায়েলের স্বীকৃতি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করতে পারে, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ উসকে দিতে পারে এবং ইসলামাবাদের ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক কূটনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

সৌদি সমীকরণ

পাকিস্তান যদিও জোর দিয়ে বলে যে তাদের পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্তগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন, তবু বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল–বিষয়ক নীতির পরিবর্তন সৌদি আরবের অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবে। ইসলামাবাদের ওপর রিয়াদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব রয়েছে। এই সম্পর্ক কূটনীতিরও ঊর্ধ্বে। সৌদি আরব দীর্ঘকাল ধরে পাকিস্তানকে আর্থিক সহায়তা, বিনিয়োগ, লাখ লাখ পাকিস্তানি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং ব্যাপক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

উভয় দেশ সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত একটি নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে তাদের সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, যেকোনো একটি দেশের ওপর আক্রমণ উভয় দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে। অনেক পর্যবেক্ষক তাই মনে করেন, ইসরায়েলের প্রতি সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ যেকোনো বিতর্ককে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।

গাজা ‘ফ্যাক্টর’

২০২৩ সালের অক্টোবরের আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবকে আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে রাজি করানোর চেষ্টা করছিল। অনেক বিশ্লেষক সৌদি-ইসরায়েলের সম্পর্ক নিয়ে ইতিবাচকও ছিলেন। রিয়াদের এমন পদক্ষেপ পাকিস্তানকেও চাপে ফেলত। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের আক্রমণ এবং এর পরবর্তীকালে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এই সম্ভাবনাকে পুরো উল্টে দেয়।

গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসরায়েলের সঙ্গে এই সম্পর্কের সমর্থন মুসলিম বিশ্বে তীব্রভাবে হ্রাস পায়। পাকিস্তানেও জনমত তীব্র হয়েছে। ২০২৩ সালের এক জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ পাকিস্তানি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল, অন্যদিকে মাত্র ২ শতাংশ ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল। ধর্মীয় গোষ্ঠী, মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলো এ যুদ্ধকে একটি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছে যে একটি কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই অসমর্থনযোগ্য হবে। এখন পর্যন্ত পাকিস্তানের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে।

ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া পাকিস্তানের জন্য এটাই প্রথম নয়। পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক গতিশীলতা এবং পর্যায়ক্রমিক নীতি পরিবর্তনের জল্পনাকল্পনা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সাত দশকের পুরোনো রেডলাইন এখনো দৃঢ়ভাবে বজায় রয়েছে।