নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ, যিনি একজন জনপ্রিয় র্যাপার, তার শাসনের প্রথম দুই মাসে নানা বিতর্ক ও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার সবচেয়ে হিট গান ‘ম নেপালও হাসেকো হের্ন চাহাচ্ছু’ বাংলায় যার অর্থ ‘আমি দেখতে চাই নেপাল হেসে উঠুক’, মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ পাওয়া এই গান তাকে কাঠমান্ডুর মেয়র হতে সাহায্য করে এবং এখন তিনি প্রধানমন্ত্রী। নেপালের জেন-জি প্রজন্মের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন, কিন্তু তার শাসনশৈলী নিয়ে সর্বমহলে প্রত্যাশায় টান পড়েছে।
পার্লামেন্টে অনুপস্থিতি ও সমালোচনা
৩৬ বছর বয়সী এই র্যাপার প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে খুব কম আসেন এবং কথা বলেন আরও কম। অথচ তার অফিস ও পার্লামেন্ট পাশাপাশি অবস্থিত। নেপালের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয়-সাত সপ্তাহেও প্রধানমন্ত্রী পার্লামেন্টে কোনো বক্তব্য দেননি। কাঠমান্ডু পোস্ট-এর ১৪ মে সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ‘বিভিন্ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কথা শোনার অধিকার রয়েছে জনগণের’। আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘সংসদে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের প্রথা এবং জবাবদিহির সঙ্গে মানানসই নয়’।
প্রেসিডেন্টের ভাষণের সময় চলে যাওয়া
২ এপ্রিল পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্রের ভাষণের সময় প্রধানমন্ত্রী মাঝপথে উঠে চলে যান, যা জাতীয়ভাবে বিস্ময় সৃষ্টি করে। তিনি এখন পর্যন্ত কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বক্তৃতা দেননি এবং প্রশ্নোত্তর পর্বেও অংশ নিতে রাজি নন। তার কাছে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ভার দেওয়া হয়েছে অর্থমন্ত্রীকে। জেন-জি সরকার দেশকে অনেকটা রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতিতে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও আদালতের স্থগিতাদেশ
গত দুই মাসে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে নিজের কর্তৃত্ব বাড়াতে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বদলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে সংযুক্ত করা, যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন করেছিল। এছাড়া ভাসমান মানুষদের বস্তিসদৃশ আবাস বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে বিক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। অক্সফামের গবেষণা অনুযায়ী, নেপালের শীর্ষ ১ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় সম্পদের ২৫ শতাংশ থাকলেও নিচের ৫০ শতাংশের হাতে রয়েছে ৫ শতাংশের কম। সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অমানবিক বলা হচ্ছে।
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক
জ্যেষ্ঠ তিনজন বিচারপতিকে ডিঙিয়ে মনোজ কুমার শর্মাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ঐতিহ্যের লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার দাবি করছে, সংবিধান পরিষদ এই নিয়োগের সুপারিশ করেছে এবং পার্লামেন্টের অনুমোদন রয়েছে। তবে সংবিধান পরিষদের প্রধান খোদ প্রধানমন্ত্রী এবং পার্লামেন্টে তার সরকারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট হয়েছে এবং বিচার বিভাগের মধ্যে নীতিগত বিভেদরেখা তৈরি হয়েছে।
ট্রেড ইউনিয়ন ও ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত স্থগিত
অফিস-আদালতে কর্মচারীদের ইউনিয়ন গঠন এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সংগঠন করার অধিকার বন্ধের সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালত স্থগিত করে দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছে, কর্মচারীদের ইউনিয়ন গঠনের অধিকার ১৯৯২ সালের সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট ও আইএলও সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছে। সরকার অবশ্য দাবি করছে, দলীয় পরিচয়ের সংগঠন বিদ্যাপীঠ ও সরকারি দপ্তরে দক্ষতার ক্ষতি করছে।
সীমান্ত শুল্ক নীতি স্থগিত
সীমান্তপথে আসা নিত্যদিনের পণ্যের ওপর ৫ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্তও আদালত স্থগিত করে দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্ত সীমান্তবর্তী মানুষের জীবনযাত্রায় ছন্দপতন ঘটিয়েছিল, কারণ নেপালের বহু মানুষ নিত্যদিনের কেনাকাটার জন্য ভারতীয় বাজার-হাটে যান। শাসক দলের নেতা-কর্মীরাও মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত সীমান্তবর্তী মানুষকে ক্ষুব্ধ করছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দলের দূরত্ব
ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দূরত্ব লক্ষণীয়। তিনি পার্টির বৈঠকে সচরাচর আসেন না এবং দলের খুব কম নেতাই তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। আরএসপি ২০২২ সালে বিভিন্ন পেশাজীবী তরুণ-তরুণী দ্বারা গঠিত এবং এবারের নির্বাচনে তাদের জয় মূলত জেন-জি অভ্যুত্থানের জোয়ারে ও বালেন শাহের জনপ্রিয়তার ওপর ভর করে। কিন্তু সমাজে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি বিরক্তি দলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে অস্বস্তি
নেপালের দুই প্রতিবেশী চীন ও ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। বালেন শাহের দল নির্বাচনের আগে বলেছিল, তারা ‘বাফার রাষ্ট্র’ না হয়ে ‘সংযোগকারী রাষ্ট্র’ হতে চায়। তবে সরকার গঠনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর নেপাল সফর করেছেন এবং তিব্বতি শরণার্থীদের নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন, যা চীনকে উদ্বিগ্ন করেছে। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রির কাঠমান্ডু সফর বাতিল হয়েছে, যা নয়া দিল্লিকে বিব্রত করেছে।
পোশাক নিয়েও বিতর্ক
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বালেন শাহের পোশাক-আশাক নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তিনি প্রথাগত নেপালি পোশাকের বদলে জমকালো ড্রেস ও স্পোর্টস শু পরে পার্লামেন্টে হাজির হন, যা নিয়মিত ভাইরাল হচ্ছে। ১৬ মে তিনি সাদা পোশাক পরে ফেসবুকে ছবি ছাড়েন, যা তাৎক্ষণিকভাবে ভাইরাল হয়। গবেষকরা মনে করছেন, এটি প্রাথমিক কঠোরতার পর নমনীয় শাসননীতির ইঙ্গিত হতে পারে।
প্রজন্মগত পরিবর্তনের আভাস
বালেন শাহ শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি। এই প্রজন্মের ‘নেতা’রা নতুন নাগরিক সমাজকে মাতিয়ে রাখতে চাইছেন এবং তাদের কৌশলের সফলতা অস্বীকার করা যায় না। দেশ চালাতে ‘রাজনীতিবিদ’ হওয়া জরুরি নয়, ‘জনপ্রিয়’ হলেই চলছে—নেপালের অভিজ্ঞতা আপাতত এটাই বলছে।



