দেশ-বিদেশের রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও রহস্যঘেরা শব্দ ‘ডিপ স্টেট’ বা গুপ্ত শক্তি। যে শক্তি রাজনীতির অদৃশ্য খেলোয়াড় হিসেবে ভূমিকা রাখে। পৃথিবীর পরাশক্তি বা ক্ষমতাধর দেশগুলোর সামরিক, বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নিজ দেশের বাইরেও বিশ্বজুড়ে ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা পালন করে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও শব্দটি নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। টেলিভিশন টক শো, সেমিনার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে চলছে নানামুখী বিশ্লেষণ।
গুপ্ত শক্তি কী?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে— দৃশ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো ও সরকারের আড়ালে থেকে কাজ করা এক প্রভাবশালী, স্বার্থান্বেষী ও গুপ্ত নেটওয়ার্কই হলো ‘ডিপ স্টেট’।
পর্দার আড়ালের আসল শাসক
আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান কিংবা গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার বদলায়, সংসদে নতুন মুখ আসে, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা পাল্টান। কিন্তু অনেক সময়ই দেখা যায়, পুরোনো শাসনতান্ত্রিক বন্দোবস্ত বা কাঠামোর বাইরে যাওয়ার শক্তি থাকে না নতুন সরকারের। পর্দার আড়ালের এই গুপ্ত শক্তিগুলোই মূলত ঠিক করে দেয় কোন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হবে, আর কোনটি ফাইলের ভেতরে বন্দি থাকবে। নিজেদের কায়েমি স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রণ টিকিয়ে রাখতেই এরা জাতীয় নীতিকে প্রভাবিত করে।
কোনও কোনও সরকার বা নেতৃত্ব এই ব্যবস্থার বাইরে বের হতে চাইলেও, শেষ পর্যন্ত সেই সংঘবদ্ধ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। সরকার যখন কোনও স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র কিংবা দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অদৃশ্য বাধার মুখে পড়ে, তখনই এই ‘ডিপ স্টেট’-এর অস্তিত্ব টের পাওয়া যায়। স্বাভাবিকভাবেই তখন প্রশ্ন ওঠে— রাষ্ট্রের আসল ক্ষমতা কি সত্যিই নির্বাচিত সরকারের হাতে, নাকি এই গুপ্ত শক্তির কাছে? তবে মজার বিষয় হলো— ডিপ স্টেটের এই চাপ বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তখনই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়, যখন তারা ক্ষমতার বাইরে থাকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং পরবর্তী সময়ে নতুন সরকারের ক্ষমতায় আসার পেছনেও দেশি-বিদেশি ‘ডিপ স্টেট’-এর সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ডিপ স্টেটের’ ভিন্ন রূপ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের আলোচনায় ‘ডিপ স্টেট’ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা দেশ বা পাকিস্তানের মতো এখানে হয়তো সামরিক-বেসামরিক গোয়েন্দা বা করপোরেট জোটের একক আধিপত্য সবসময় দৃশ্যমান থাকে না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিপ স্টেটের একটি নিজস্ব ও ভিন্ন রূপ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে ডিপ স্টেট বলতে সুনির্দিষ্ট কোনও একটি সংস্থাকে বোঝায় না। বরং এটি হলো– দলীয়করণ হওয়া আমলাতন্ত্র, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী (অলিগার্ক) এবং বিচার বিভাগের একটি প্রভাবশালী অংশের গোপন সিন্ডিকেট।
এরা দৃশ্যমান রাজনৈতিক সরকারের পেছনে থেকে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ, নিয়ন্ত্রণ এবং নিজেদের আখের গোছাতে কাজ করে। ‘ওয়ান ইলেভেনের’ দুই বছর ও আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে এই গোষ্ঠীটি রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর এতটাই শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, সাধারণ মানুষের ভোটের অধিকার বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়াই দীর্ঘদিন রাষ্ট্রব্যবস্থা সচল রাখতে তারা সক্ষম হয়।
ভোটের রাজনীতিতে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগের শাসনামলটি কোনও সামরিক শাসন ছিল না। কিন্তু আমলাতন্ত্র, পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা, নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগ দলীয়করণের ফলে এই অনির্বাচিত কর্মকর্তারা নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ রক্ষার্থেই তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ‘ডিপ স্টেট’ হিসেবে কাজ করেছিল। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলো এদেরই যৌথ প্রযোজনায় সম্পাদিত হয়েছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
গণঅভ্যুত্থান ও ‘ডিপ স্টেটের প্রতিরোধ’
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করলে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থেকে নানা ধরনের প্রতিরোধের অভিযোগ ওঠে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ধীরগতি, ফাইল আটকে রাখা কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরির মতো ঘটনাকে অনেকে ‘ডিপ স্টেটের প্রতিরোধ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাত, বিদ্যুৎ খাত এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণকারী অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটও বাংলাদেশের ডিপ স্টেটের অংশ হিসেবে কাজ করে। অর্থপাচারকারী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর প্রভাব বজায় রাখে। এছাড়া, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়া, প্রশাসনে একাধিক রদবদল সত্ত্বেও নিচের স্তরে স্থবিরতা তৈরি হওয়া প্রমাণ করে যে, প্রাতিষ্ঠানিক ‘সিন্ডিকেট’ কতটা গভীরে শিকড় গেড়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের ইতিহাসে সামরিক বেসামরিক ডিপ স্টেটের গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে। দীর্ঘ সময় সামরিক শাসনের কারণে বাংলাদেশে ডিপ স্টেট গড়ে ওঠে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের চেয়ে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং সিভিল আমলারা রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে প্রধান ভূমিকা পালন করতো। ১৯৯০ সালের পর দৃশ্যত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরলেও এই কাঠামো টিকে যায় রাজনৈতিক দলগুলোর কায়েমি স্বার্থের কারণে। উপরন্তু দিনে দিনে এটা আরও শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। যুক্ত হয় অর্থ পাচারকারী লুটেরা গোষ্ঠী। গুটিকয়েক বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, যারা ব্যাংক লুটের মাধ্যমে বা মেগা প্রজেক্টের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। এরা রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। যেকোনও সরকারের নীতিকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে, যা বর্তমানে দৃশ্যমান।
সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ যা বলেন
গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভায় দলটির মুখপাত্র সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তার দাবি অনুযায়ী, সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার শুরুর দিকে কিছু ‘প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান’ ও দেশি-বিদেশি শক্তি এ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিল।
তিনি বলেন, এই ‘ডিপ স্টেট’ কোনও একক গোষ্ঠী নয়। বরং দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন শক্তির সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রভাববলয়। তবে কারা এই শক্তির অংশ— সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্টভাবে কারও নাম প্রকাশ করেননি। পরে তার এই বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটিকে রাষ্ট্রের অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন।
রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের বক্তব্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার বিভিন্ন টকশো ও বক্তব্যে বলেছেন, ডিপ স্টেট হলো— এমন এক স্থায়ী বন্দোবস্ত যা সংবিধান, আমলাতন্ত্র, করপোরেট পুঁজি এবং বিদেশি শক্তির সমন্বয়ে গঠিত। তিনি মনে করেন, যে পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি সম্পূর্ণ নতুন ‘সাংবিধানিক গঠন’ বা নতুন গণপরিষদ তৈরি করে এই পুরোনো কাঠামো উপড়ে না ফেলবে, সে পর্যন্ত সরকার বদলালেও ক্ষমতার আসল চাবিকাঠি পর্দার আড়ালের ‘ডিপ স্টেট’-এর হাতেই থেকে যাবে।
এ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ''সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী অদৃশ্য শক্তিগুলো অপরিবর্তিতই থেকে যায়। এরা কখনও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, কখনও আমলাতন্ত্র, কখনও শক্তিশালী মিডিয়া, আবার কখনও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে কাজ করে।'' তাঁর মতে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও এই গভীর প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের বাইরে নয়।
তিনি বলেন, “ডিপ স্টেট ধারণাটি শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কোনও না কোনোভাবে বিদ্যমান।” তার ভাষায়, “ডিপ স্টেট মানেই সরকার নয়, বরং সরকারের বাইরে থেকেও যারা রাষ্ট্র পরিচালনা বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাদের একটি অদৃশ্য শক্তি বা কাঠামো।”
বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ডিপ স্টেটের চরিত্র আরও বহুমাত্রিক বলে মনে করেন মাসুদ কামাল। তিনি বলেন, ''এখানে সামরিক বেসামরিক আমলাতন্ত্র, বড় ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ব্যক্তি, বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো অনেক সময় নেপথ্যে থেকে সরকার গঠন ও পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে। তারা সরাসরি সামনে থাকে না, কিন্তু পেছন থেকে সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। যখন এই প্রভাব অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, তখন সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তারাও একধরনের ডিপ স্টেটের অংশ।''
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে মাসুদ কামাল বলেন, ''ইউনূস সরকারের উত্থান কিংবা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পেছনেও বিভিন্ন ধরনের অদৃশ্য শক্তি বা ডিপ স্টেটের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আছে।''
ডিপ স্টেট কি কেবলই ‘কনস্পিরেসি থিওরি?’
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই ডিপ স্টেটের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে, এটি কোনও কাল্পনিক বিষয় বা কেবলই ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ নয়। যেকোনও দেশের স্থায়ী আমলাতন্ত্র ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নিজস্ব একটা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ থাকে। তারা যেকোনও মূল্যে সেই স্বার্থ এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী নীতি, যেমন- ফরেন পলিসি বা ডিফেন্স পলিসি বজায় রাখতে চায়, যা সাধারণ মানুষের ভোটের চেয়েও অনেক সময় শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
তবে এর বিপরীত মতও রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, অনেক সময় ব্যর্থ বা পপুলিস্ট রাজনীতিকরা নিজেদের ভুল নীতি, অযোগ্যতা ও ব্যর্থতা ঢাকতে ‘ডিপ স্টেট’-এর জুজু খাড়া করেন। কোনও অদৃশ্য শক্তির ওপর দোষ চাপিয়ে জনগণের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য এই শব্দটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করাও রাজনীতিকদের কৌশল।



