ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা মহলে আলোচনা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রথমেই বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, আর আওয়ামী লীগের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হবে অতীত শাসনামল নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা। ফলে তার প্রত্যাবর্তন নিয়ে যে গুঞ্জন চলছে, তা বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ বলেই বেশি প্রতীয়মান হচ্ছে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪ মাস পার হয়েছে। এই সময়ে সরকারের ভুল-ভ্রান্তি জনমনে ততটা স্পষ্ট হয়নি, এবং হাসিনাবিরোধী তথা গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো তার প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ আছে। দেশীয় জনমত বা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন কোনো পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত হাসিনা বা আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রভাব
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত তরুণ প্রজন্ম এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং আওয়ামীবিরোধী জনমত দেশে বিদ্যমান। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের যে আলোচনা হচ্ছে, তা অনেকাংশেই রাজনৈতিক প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডার অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের বক্তব্য
সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম যুগান্তরকে বলেন, দেশে অপরাধ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগের বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের লক্ষ্য কখনোই আরেক ধরনের কর্তৃত্ববাদী বা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতাই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মতামত
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দেশে থাকলেও গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটিতে আত্মসমালোচনা বা নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। তবে দলটি যদি অতীত ভুল সংশোধনের উদ্যোগ নেয় ও নতুন রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে আসে, তাহলে জনগণ তাদের বিবেচনা করতে পারে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিনের বিশ্লেষণ
রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা জবাবদিহি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার কূটনৈতিকভাবে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে, কারণ তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর আইনি নিষ্পত্তি প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে এবং বর্তমান বাস্তবতায় তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন এমন সম্ভাবনা নেই।
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের দৃষ্টিভঙ্গি
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই, তবে আওয়ামী লীগ একটি পুরোনো ও বড় দল, যা রাজনীতিতে ফিরে আসার চেষ্টা করবে। তবে তাদের বড় সমস্যা হলো গত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামল নিয়ে জবাবদিহি, যা তারা সহজে মোকাবিলা করতে চাইবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্লেষকের মন্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক যুগান্তরকে বলেন, বর্তমানে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতি করার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে তারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে এবং সরকারকে এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ ও মোকাবিলা করতে হবে।



