জাতীয় সংসদে সাবেক স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ও প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারকে স্মরণ করা হয়েছে। রবিবার (১২ জুলাই) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা প্রথম বাজেট অধিবেশনের ২৩তম কার্যদিবসে তার মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে বিকেল ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ছিলেন সততা ও পেশাগত সুনামের অনন্য উদাহরণ। দীর্ঘ আইনজীবী জীবনে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি, মক্কেল বা সহকর্মীর কাছ থেকে কখনো কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি। দলের প্রতি তিনি ছিলেন শতভাগ নিবেদিতপ্রাণ।
তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভদ্রলোক। তাকে প্রায় সবসময়ই থ্রি-পিস স্যুটে দেখা যেত। তার পোশাক-পরিচ্ছদই যেন ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছিল। একবার তার এলাকার একজন ভোটার তাকে পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখে চিনতেই পারেননি।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘স্পিকার, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি কিংবা আইনজীবী—যে পরিচয়েই তাকে স্মরণ করি না কেন, তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান মানুষ। তিনি সংসদের স্ট্যান্ডিং কমিটির অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলেন। বয়সের কারণে এবার নিজে নির্বাচন না করে ছেলে ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। আমার বিশ্বাস, তিনি নির্বাচন করলে জয়ী হতেন।’
তিনি আরও বলেন, প্রথা অনুযায়ী সংসদ ভবন প্রাঙ্গণেই তাকে দাফন করা হবে। ফলে শারীরিকভাবে না থাকলেও তিনি সংসদের সঙ্গেই থেকে যাবেন।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন পেশাগত ও রাজনৈতিক—উভয় জীবনেই সফল এবং বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি সততা, মানবিকতা ও দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমাদের নেতাকর্মীরা যখন নানা আইনি জটিলতায় পড়তেন, তখন তিনি বারবার তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আদালতে লড়েছেন, কিন্তু কখনও পারিশ্রমিক নেননি। তিনি বলতেন, এটি তার নৈতিক দায়িত্ব। এই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্পিকার হিসেবে তিনি সংসদকে প্রাণবন্ত করেছিলেন। আইন অঙ্গনে তিনি ছিলেন অনেকের শিক্ষক। মহান আল্লাহ যেন তার ভুলত্রুটি ক্ষমা করে তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন।
অন্যান্য বক্তব্য ও শেষকৃত্য
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন ছিলেন একজন ‘সেলফ-মেড ম্যান’। নিজের মেধা ও যোগ্যতায় তিনি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একাধিকটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি কখনও নির্বাচনে পরাজিত হননি এবং শেষ দিন পর্যন্ত গণতন্ত্র ও নির্বাচনের প্রতি অবিচল ছিলেন।
প্রবীণ রাজনীতিবিদ ড. খন্দোকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টে দূর থেকে হ্যাট, কোট ও ছাতা হাতে কাউকে দেখলেই বোঝা যেত তিনি ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার। তিনি তার মক্কেলদের বিষয়ে অত্যন্ত আন্তরিক ও দায়িত্বশীল ছিলেন।’
আলোচনা শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, ‘জাতি আজ একজন মহান রাজনীতিক ও সাদা মনের মানুষকে হারিয়েছে। স্পিকার হিসেবে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করেছেন। তার বিরুদ্ধে কখনও কোনো অভিযোগ শোনা যায়নি।’
এ সময় বিএনপির এ এম মাহাবুব উদ্দিন খোকন, এনসিপির আখতার হোসেন এবং জামায়াতের নাজিবুর রহমানও শোক প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য দেন।
আলোচনা শেষে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। পরে তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার রোববার ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।



