নোয়াখালীর হাতিয়া-নলচিরা নৌপথে যাত্রী ও মালবাহী যানবাহন নিয়ে ছেড়ে যাওয়া ফেরি ‘মহানন্দা’ মাঝ নদী থেকে ঘুরিয়ে আবার ঘাটে ফিরিয়ে আনার নজিরবিহীন অভিযোগ উঠেছে। নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদকে ফেরিতে তোলার জন্যই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সাধারণ যাত্রীদের দাবি। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মাঝ নদী থেকে ফেরি ঘুরিয়ে আনার ঘটনায় যাত্রীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তা উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
ঘটনার বিবরণ
শনিবার (১১ জুলাই) বিকালে হাতিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান ঘাটে এই ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ঘাট সূত্রে জানা যায়, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিকাল সাড়ে ৩টায় চেয়ারম্যান ঘাট থেকে নলচিরা ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রী ও মালবাহী যানবাহন নিয়ে যাত্রা শুরু করে ফেরি মহানন্দা। নদী উত্তাল থাকায় ফেরিটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছিল। কিন্তু প্রায় ২৩ মিনিট চলার পর হঠাৎ করেই ফেরিটি দিক পরিবর্তন করে পেছনের দিকে অর্থাৎ চেয়ারম্যান ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মাঝ নদীতে আচমকা ফেরির এমন দিক পরিবর্তনে আতঙ্কিত ও বিস্মিত হন ফেরিতে থাকা শতাধিক যাত্রী।
এমপির আগমনে ফেরি ফিরিয়ে আনার নির্দেশ
ফেরিটি পুনরায় চেয়ারম্যান ঘাটে এসে ভেড়ার পর দেখা যায়, সেখানে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল হান্নান মাসউদ তার বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সফরসঙ্গী নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ঘাটে নামার পর এমপি ও তার অনুসারীরা ফেরিতে ওঠেন। এরপর ফেরিটি দ্বিতীয়বারের মতো নলচিরা ঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।
ঘাট ইজারাদারের প্রতিনিধি জহির বলেন, “প্রথমে ফেরির মাস্টার আমাদের জানিয়েছিলেন ফেরি এখন ছাড়বে না। পরে আবার জানানো হয়, নির্ধারিত সময়েই ফেরি ছাড়বে; কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যাওয়ার প্রায় ২৩ মিনিট পর জানতে পারি, এমপি হান্নান মাসউদকে নেওয়ার জন্য ফেরিটি আবার ঘাটে ফিরে আসছে।”
ফেরি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
ফেরি মহানন্দার মেরিন ইঞ্জিনিয়ার সাজ্জাদুল ইসলাম মাঝ নদী থেকে ফেরি ফিরিয়ে আনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ছাড়ার কিছুক্ষণ পর এমপির জন্য ফেরিটি ঘাটে ফিরে আসে।” তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, “ভিআইপিদের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।” ফেরির মাস্টার নুরুল আমীন জানান, ফেরিটি ঘাট ছেড়ে যাওয়ার পর মেরিন ইঞ্জিনিয়ার নিজেই তাকে বিষয়টি অবহিত করেন। মেরিন ইঞ্জিনিয়ার তাকে জানান যে ঘাটে এমপি এসেছেন এবং ফেরি ঘুরিয়ে তাকে নিয়ে যেতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি ফেরিটি ঘাটে ফিরিয়ে আনেন।
যাত্রীদের ক্ষোভ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফেরির একাধিক যাত্রী তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এমনিতেই বৈরী আবহাওয়া, নদী উত্তাল। এর মধ্যে মাঝপথ থেকে এভাবে ফেরি ঘুরিয়ে আনা আমাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলার শামিল। একজন ভিআইপির জন্য শতাধিক সাধারণ যাত্রীর মূল্যবান সময় নষ্ট করা এবং মাঝপথ থেকে ফেরি ফিরিয়ে আনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ফেরিটি যদি মাঝ নদী থেকে ঘুরে না আসত, তবে ওই সময়ের মধ্যেই আমরা নলচিরা ঘাটের কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারতাম।”
এমপির মন্তব্য পাওয়া যায়নি
নৌপথের নিয়ম ভেঙে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে ফেরি ঘুরিয়ে আনার বিষয়ে এমপি আব্দুল হান্নান মাসউদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল ফোনে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।



