জামায়াতে ইসলামীর আমির: শাসক বদলেছে, শোষণ বদলায়নি, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন চাই
দেশে শাসক বদলেছে, তবে শোষণের ধারা বদলায়নি বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেন, "আমরা চাই, দেশে গণতন্ত্রের ধারা প্রতিষ্ঠিত হোক। কিন্তু একটি দল নির্বাচিত হয়েই বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসন নিয়োগ দিচ্ছে। জনগণের রায়কে অমান্য করার চেষ্টা করছে।"
স্বাধীনতা দিবসের আলোচনা সভায় বক্তব্য
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আয়োজনে ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। 'এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা, চিরকাল অম্লান থাকুক এই মহিমা' শীর্ষক স্লোগানে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান পবিত্র কুরআন থেকে তিলওয়াতের মাধ্যমে শুরু হয়।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যপরিষদ সদস্য ও দলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নায়েবে আমির আব্দুস সবুর ফকিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম। এছাড়া অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন:
- সাবেক এমপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার
- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন
- ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন
গণতন্ত্রের নিয়মে সরকারের সমালোচনা
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, "গণতন্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী একটি দল সরকারে থাকবে, আরেকটি দল বিরোধী হবে। সরকার ঠিক করলে সরকারকে সহযোগিতা করবে, আর ঠিক না করলে বিরোধিতা করবো। আমরা গণতন্ত্র অনুযায়ী সরকারের সব ভালো কাজে সহযোগিতা করবো।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা যদি এই সরকারের ব্যর্থতা চাইতাম, তাহলে এখন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতাম। আমরা চাই সরকার সফল হোক। কিন্তু সরকারই যদি উল্টো পথে হাঁটে তাহলে আমাদের তো কিছু করার থাকবে না।"
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান
সরকারকে সঠিক পথে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলেন, "আসুন, জনগণের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করি। শুনুন এ দেশের মানুষ কি চায়। যদি জুলাই সনদ মেনে নেয়া না হয় তাহলে হাদি হত্যা বিফল যাবে, ফেলানী হত্যা বিফলে যাবে, আবরার ফাহাদ হত্যা বিফলে হবে। দেশের জনগণ এটি কখনো হতে দিবে না।"
তিনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বলেন, "পাকিস্তানিরা জনরায়কে মূল্যায়ন না করে এ দেশে লুণ্ঠন করেছিল। তাই তাদের বিরুদ্ধে আমাদের ১৯৭১ সালে অস্ত্র হাতে নিতে হয়েছিল। আপনারাও যদি জনরায়কে মেনে না নেন, তাহলে আমাদের তরুণরা কঠিন ভাষায় তার জবাব দেবে।"
অন্যান্য বক্তাদের মতামত
আলোচনা সভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে এলডিপির চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বীর বিক্রম বলেন, "আমি একজন তরুণ ক্যাপ্টিন হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তার অন্যতম কারণ ছিল বৈষম্য, সুশাসনের অভাব। এখনও আমাদের দেশে সরকার ও সরকার দলীয় মানুষ ছাড়া সাধারণরা বৈষম্যহীন সেবা পাচ্ছে না।"
তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "আপনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জাতীর কাছে প্রসিদ্ধ হতে পারেন। জনগণের রায়ের বিপক্ষে হাঁটবেন না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করে জনগণের রায় মেনে নিন।"
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, "কোনো দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম হয় মানুষের বৈষম্য, শোষণের অবসান ঘটাতে। আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার ৫৫ বছরে পা দিলেও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।"
সংসদ সদস্যদের অবস্থান
ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, "বিএনপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করার পরও সেটি বাস্তবায়ন কেন করতে চাচ্ছে না, সেটি জাতির কাছে এখন অস্পষ্ট। তারা তো জুলাই সনদ মেনে নিয়েই গণভোট ও জাতীয় নির্বাচনে এসেছিলেন। কিন্তু এখন তারা জনগণের রায়ের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।"
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন বলেন, "যারা ২৪-কে ব্যর্থ করতে চান, তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে চাই, আমরা ২৪-কে ব্যর্থ হয়ে যেতে দেব না। আমরা জুলাই সনদকে বিলীন হতে দেব না। যারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, তারা সংসদের ভেতরে এবং আমরা বাহিরে থেকে আমাদের লড়াই চালিয়ে যাব।"
পটুয়াখালী-২ বাউফল আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ, ঢাকা-৫ আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন প্রমুখ।



