যুদ্ধাপরাধীদের শোকপ্রস্তাবে সিপিবি-বাসদ-উদীচীর তীব্র প্রতিবাদ, ৪১ নাগরিকের বিবৃতি
যুদ্ধাপরাধীদের শোকপ্রস্তাবে সিপিবি-বাসদ-উদীচীর প্রতিবাদ

যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোকপ্রস্তাব: রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের তীব্র নিন্দা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোকপ্রস্তাব গ্রহণের ঘটনায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটি একে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও নির্যাতিত নারীদের আত্মত্যাগের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে উল্লেখ করেছে। শুক্রবার সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

সিপিবির বিবৃতি: ক্ষমার অযোগ্য ধৃষ্টতা

বিবৃতিতে সিপিবি নেতারা বলেন, 'একাত্তরে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের তল্পিবাহক গোষ্ঠীর লোকেরা সংসদে আসন গ্রহণ করে দণ্ডিত ঘাতকদের নামে শোকপ্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। দেশের মানুষ এটা কখনোই ভুলবে না।' তাঁরা এই পদক্ষেপকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সরাসরি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বাসদের দাবি: শোকপ্রস্তাব থেকে নাম প্রত্যাহার

এদিকে, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)ও এই শোকপ্রস্তাব গ্রহণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। দলটি শোকপ্রস্তাব থেকে যুদ্ধাপরাধীদের নাম প্রত্যাহারের জোরালো দাবি তুলেছে। বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এক বিবৃতিতে বলেন, 'সরকারদলীয় চিফ হুইপ গণহত্যার সহযোগী স্বীকৃত রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোকপ্রস্তাব গ্রহণের কথা বলেন এবং স্পিকার কর্তৃক তা গৃহীত হওয়া বাংলাদেশের মানুষের গণচেতনাকে পদদলিত করার কলঙ্কময় নজির।'

বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, 'দেশের আপামর জনগণ এ ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধ ও ৩০ লক্ষ শহীদদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করে এবং ধিক্কার জানায়। এই ঘটনায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ গত ৫৪ বছরের গণ–আন্দোলনের চেতনাসমূহকে হেয় করা হয়েছে।'

উদীচীর অভিযোগ: জাতীয় সংগীতের অবমাননা

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীও শোকপ্রস্তাবের নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংগঠনটি জাতীয় সংগীতের সময় উঠে না দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের জাতীয় সংগীতের অবমাননার অভিযোগ এনে তাঁদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে এক বিবৃতিতে বলেন, 'আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দণ্ডপ্রাপ্ত কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের নাম শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা শুধু ইতিহাস কলঙ্কিত করা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতিও চরম অবমাননা।'

উদীচী নেতারা আরও বলেন, 'জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে এমন কাজ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়। জাতীয় সংগীতের প্রতি অবমাননাকর আচরণ দেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং জাতির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।'

৪১ বিশিষ্ট নাগরিকের জোরালো দাবি

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত রাজাকারদের প্রতি শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ৪১ জন কবি, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক ও উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তি। তাঁরা এক বিবৃতিতে অবিলম্বে জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এই শোকপ্রস্তাবের অংশ প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'ভবিষ্যতে যাতে সংসদ বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিতর্কিত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।'

এই ঘটনাটি জাতীয় সংসদের কার্যক্রমে একটি বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করেছে, এবং অনেকেই এই শোকপ্রস্তাবের নৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।