ত্রয়োদশ সংসদের উত্তাপ: ইতিহাসে ফিরে দেখা বাংলাদেশের সংসদীয় যাত্রার প্রথম দিনগুলো
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই ঘটনা নিয়ে আলোচনা থেমে নেই, কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এমন পরিস্থিতি কি এবারই প্রথম? ইতিহাসে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, বাংলাদেশের সংসদীয় যাত্রায় এমন ঘটনা ঘটেছে বারবার। গণপরিষদ থেকে শুরু করে গত ১২টি সংসদের অধিবেশনের প্রথম দিনের অনেকটিই ছিল ঘটনাবহুল, উত্তপ্ত ও বিতর্কিত।
গণপরিষদ থেকে শুরু: স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আইনসভা
১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌম গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনে স্পিকার ছিলেন শাহ আবদুল হামিদ, ডেপুটি স্পিকার মোহাম্মদ উল্লাহ, এবং গণপরিষদ নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মজার বিষয় হলো, এই অধিবেশনে নোয়াখালীর সদস্য খাজা আহমদ লুঙ্গি-শার্ট পরে যোগ দিয়েছিলেন, যা তখনকার সময়ে অস্বাভাবিক ছিল না। অধিবেশন কক্ষে ধূমপানের ঘটনাও ঘটেছিল, যদিও তা নিষিদ্ধ ছিল। দুই ঘণ্টার এই অধিবেশনে স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রস্তাব পাস করা হয়।
প্রথম সংসদ: বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যাত্রা
১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিল প্রথম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে। এই সংসদে স্পিকার নির্বাচিত হন মোহাম্মদ উল্লাহ, এবং সংসদ নেতা হিসেবে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। এই সংসদে সংবিধানের প্রথম চারটি সংশোধনী আনা হয়, যার মধ্যে ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রথম সংশোধনীটি উল্লেখযোগ্য। তবে এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র আড়াই বছর, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর এটি বিলুপ্ত হয়।
দ্বিতীয় সংসদ: শপথ বর্জন ও হট্টগোল
১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল দ্বিতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। এই অধিবেশনে বিরোধী দলের ৫৩ জন সদস্য শপথ বর্জন করেন, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের সদস্যরা ছিলেন প্রধান। তাঁরা অস্থায়ী স্পিকার আবদুস সাত্তারকে ‘অনির্বাচিত’ বলে অভিযোগ তুলে ওয়াকআউট করেন। তুমুল হট্টগোলের পর স্পিকার তাঁদের শপথ পাঠ করান। এই সংসদে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভাষণ দেন এবং বঙ্গবন্ধু ও মাওলানা ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তৃতীয় থেকে পঞ্চম সংসদ: রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দ্বৈরথ
১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদে বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে, এবং আওয়ামী লীগ সংসদ ভবনের বাইরে ‘উন্মুক্ত সংসদ’ পরিচালনা করে। ১৯৮৮ সালের চতুর্থ সংসদে সাংবাদিকেরা অধিবেশন বর্জন করেন, যা একটি অনন্য ঘটনা। ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদে প্রথমবারের মতো সংসদ নেতা ও বিরোধী দলের নেতার আসনে দুই নারী—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা—বসেন, এবং তাঁদের দ্বৈরথ বিদেশি সংবাদপত্রে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ নামে পরিচিতি পায়।
ষষ্ঠ থেকে একাদশ সংসদ: বিতর্কিত নির্বাচন ও উত্তাপ
১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদে ‘বুড়ো আঙুল’ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, যখন আ স ম আবদুর রব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন তিনি মামলার সংখ্যা বোঝাতে আঙুল দেখিয়েছিলেন। ২০০১ সালের অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল, এবং ২০০৯ সালের নবম সংসদে বিএনপি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জন করে। ২০১৪ সালের দশম সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি প্রধানমন্ত্রীর গুণগানে মুখর হয়, যা একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। ২০১৯ সালের একাদশ সংসদে বিএনপির সদস্যরা শপথ নিলেও পরে পদত্যাগ করেন।
দ্বাদশ সংসদ: সংক্ষিপ্ত মেয়াদ ও পতন
২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়, যেখানে শিরীন শারমিন চৌধুরী টানা চতুর্থবার স্পিকার হন। তবে এই সংসদ সাত মাসও পার করতে পারেনি; জুলাই মাসের গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। এটি এক তরফা নির্বাচনের ভয়াবহ পরিণতির নজির হয়ে থাকে।
সর্বশেষ, ত্রয়োদশ সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে বিরোধী দলের প্রতিবাদ দেখে ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এমন উত্তাপ নতুন নয়। প্রতিটি সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে, যা দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রতিফলন।
