নারায়ণগঞ্জে ইফতার অনুষ্ঠানে এমপি আল আমিন অবরুদ্ধ, উত্তেজনা ও মামলার হুমকি
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় জামায়াতে ইসলামীর আয়োজিত একটি ইফতার অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনের বক্তব্য নিয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পঞ্চবটি বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় অনুষ্ঠিত এই ইফতার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমকে 'ফ্যাসিস্টদের দোসর' বলে মন্তব্য করায় সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমিনকে উপস্থিত শিল্পমালিক ও কর্মীরা অবরুদ্ধ করে ফেলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর রাত আটটার দিকে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে তাঁকে উদ্ধার করে।
এনসিপির মামলা করার সিদ্ধান্ত ও অভিযোগ
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই ঘটনায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বুধবার দলের দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক শওকত আলী জানিয়েছেন। তিনি মুঠোফোনে বলেন, 'সংসদ সদস্যকে অবরুদ্ধ করে রাখার সময় সন্ত্রাসীরা অস্ত্রসহ মহড়া দিয়েছে। তারা আমাদের নেতা–কর্মীদের মারধর করেছে। তাদের মারধরে শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক ফয়সাল আহমেদ চোখে গুরুতর আঘাত পেয়েছেন। এসব ঘটনায় আমরা মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।'
আব্দুল্লাহ আল আমিন নারায়ণগঞ্জ–৪ (সদর উপজেলার একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্যসচিব। তিনি গত রাতে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে চাষাড়া দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের সময় বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের দেওয়া বক্তব্যের বিষয়টি স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।
সংসদ সদস্যের বক্তব্য ও দাবি
সংবাদ সম্মেলনে আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, 'বিসিকে চিহ্নিত গুন্ডা রাসেল নামের একজন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতার নেতৃত্বে দেশি অস্ত্রসহ বেশ কিছু গুন্ডা ছেলেপেলে চলে আসে। তারা বলতে থাকে যে, আমাকে ভবন থেকে নামতে দেবে না এবং আমার বক্তব্যের জন্য সরি বলতে হবে। আমার বক্তব্য হচ্ছে, আমি কাকে সরি বলব? ফ্যাসিস্টের একজন দোসরকে সরি বলার কিছু নেই। সরি বলতে হবে তাঁকে, যিনি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে তাণ্ডব বলেছেন।'
তিনি আরও যোগ করেন, '৩ আগস্ট, যখন অলরেডি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বাংলাদেশে হাজারের ওপর মানুষ শাহাদাত বরণ করেছে, তখন শেখ হাসিনার সামনে দাঁড়ায়া তিনি (মোহাম্মদ হাতেম) জুলাইকে তাণ্ডব বলেছেন। এ রকম ব্যক্তিকে তো 'সরি' বলার কিছু নেই। উল্টো আমরা বলেছি, তাঁকে সরি বলতে হবে। ওনাকে স্পষ্ট করতে হবে। আমরা বলছি, স্পষ্ট বক্তব্য দেন—আপনি কি বাধ্য হয়ে বলেছেন, নাকি এটা আপনার বক্তব্য।'
বিকেএমইএ সভাপতির ব্যাখ্যা ও পুলিশের বক্তব্য
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম গত রাতে সাংবাদিকদের বলেন, 'ওই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারাও ছিলেন। আমাদের এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন মহোদয় তাঁর বক্তব্যের এক পর্যায়ে আমাকে ফ্যাসিবাদের দোসর বলে সম্বোধন করলে উপস্থিত শিল্পমালিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এরপর আমি মালিকদের নিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করি।'
তিনি দাবি করেন যে তিনি পুলিশকে সংসদ সদস্যকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। অন্যদিকে, ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মান্নান বুধবার সন্ধ্যায় বলেন, 'এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ অভিযোগ করেনি। আমরা ঘটনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানিয়েছি। অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।'
পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ ও রাজনৈতিক প্রভাব
গতকাল সংসদ সদস্যকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করার পর বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের বিরুদ্ধে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করেন এনসিপির নেতা–কর্মীরা। এ সময় চাষাড়ায় বিকেএমইএর প্রধান কার্যালয়ের সামনে হাতেমকে 'ফ্যাসিস্টের দোসর' স্লোগান দিয়ে তাঁকে নারায়ণগঞ্জে অবাঞ্ছিতেরও হুঁশিয়ারি দেন নেতারা।
মোহাম্মদ হাতেম ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি হিসেবে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মতবিনিময়ে অংশ নিয়ে বক্তব্য দেন, যা নিয়ে বর্তমান বিতর্কের সূত্রপাত। এই ঘটনা নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং এনসিপির মামলা করার হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
