রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যা মামলার রায়ের দিন রবিবার (৭ জুন) ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায়ের এ দিন রাখেন। ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী পঙ্কজ পিটার গোমেজ এ তথ্য জানান।
রাষ্ট্রপক্ষের সর্বোচ্চ সাজা দাবি
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে তাদের সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। তবে আসামিপক্ষ থেকে লঘুদণ্ডের প্রার্থনা করেন আইনজীবী। আসামি স্বপ্নাকে আজ সকাল ৮টার দিকে কাশিমপুর কারাগার থেকে, আর সোহেলকে ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। তাদের রাখা হয় মহানগর দায়রা জজ আদালতের হাজতখানায়। বেলা সাড়ে ১১টায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের কথা থাকলেও স্বপ্না অসুস্থ হয়ে পড়ায় শুনানি শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় তাকে।
যুক্তিতর্ক উপস্থাপন
বেলা সাড়ে ১১টার পর তাদের এজলাসে তোলা হয়। পৌনে ১২টার দিকে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রতাশা করেন তিনি। যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সাক্ষীদের জবানবন্দি বিশ্লেষণ করে তিনি আদালতকে বলেন, রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে সোহেল রানা। পরে গ্রিল কেটে বাসা থেকে পালিয়ে যায়। এসব কাজে স্বপ্না সহযোগিতা করেছে। বিচারে ১৬ সাক্ষীর জবানবন্দি ও জেরার তাদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করছি।
অন্যদিকে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমূল্যাহ দুই আসামির পক্ষে যুক্তিতর্কে অংশ নেন। তিনি বলেন, জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। যে ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটা ফরেনসিক করা হয়নি। এটার ওপর ভিত্তি করে সাজা দেওয়া যেতে পারে না। নিজেকে জড়িয়ে জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সময় সে নেশাগ্রস্ত ছিল। বিষয়টি বিবেচনা নিয়ে তার যাবজ্জীবন সাজা প্রার্থনা করছি। এ আইনজীবী বলেন, স্বপ্না আক্তারের বিষয়ে ১৬ জন সাক্ষীর দেওয়া সাক্ষ্যে লাশ গুমের অভিযোগ ছাড়া কিছুই নেই। তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় সাজা দেওয়া হোক।
এ সময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী উপস্থিত ছিলেন।
আসামিদের বক্তব্য
বুধবার আত্মপক্ষ শুনানিতে স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চায়। সোহেল ক্ষমা চেয়ে বিচারককে বলে, স্যার, আমি নির্দোষ। খালাস চাই। আমাকে মাফ করে দেন। আমার সঙ্গে ডলার ছিল, সেটা কেউ দেখে নাই। তাকে ধরেন স্যার। সেও তো দোষী।
এর আগে মঙ্গলবার মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়। ১৭ জনের মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য নেন আদালত। সোমবার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন একই আদালত।
ঘটনার বিবরণ
গত ১৯ মে দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে রামিসার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ বলেছে, ওইদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের সাবলেট এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যায়। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিল। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে সন্ধ্যায় সোহেলকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করা হয়। সোহেল আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।
এ ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা দুই জনকে আসামি করে সে দিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকতো রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে সাবলেট থাকতো। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়।
সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা। এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণের পর মেরে ফেলে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করে এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যায়।
মামলাটি তদন্ত করে গত ২৪ মে তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) অহিদুজ্জামান দুই জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। ওই দিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি দেখে বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় বদলির আদেশ দেন। মামলাটি ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ওইদিনই বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন।



