নির্বাচনী তিক্ততা পেছনে, সরকার-বিরোধী দলে নতুন সৌহার্দ্যের যুগ
নির্বাচনী তিক্ততা পেছনে, সরকার-বিরোধী দলে সৌহার্দ্য

নির্বাচনী তিক্ততা থেকে সৌহার্দ্যের পথে রাজনীতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। ভোটের বৈতরণী পার করতে নির্বাচনি প্রচারণায় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও বিষোদগারে কেউ কারো প্রতি ছাড় দেয়নি। বিএনপির প্রধান তারেক রহমান জামায়াতকে 'গুপ্ত' ও 'স্বাধীনতাবিরোধী' বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। অন্যদিকে জামায়াতের আমির বিএনপিকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। জুলাই আন্দোলন থেকে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারাও একই ধরনের অভিযোগ তুলেছিলেন।

নির্বাচন-পরবর্তী পরিবর্তিত চিত্র

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এখন পর্যন্ত এক ধরনের সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বিরোধী দলও বড় ধরনের অভিযোগ আনেনি, বরং তারা বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ ও রাজনৈতিক সৌন্দর্য

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের কয়েকটি উদ্যোগ রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃষ্টান্তমূলক। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার দুই দিন আগে তিনি বিরোধী দলের তিন শীর্ষ নেতার বাসায় ছুটে যান। টেলিফোনে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতের আমিরের স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেন। সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি তাদের ইফতার মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন। এই বিষয়গুলোকে অনেকে রাজনৈতিক সৌন্দর্য হিসেবে দেখছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নেটিজেনরা ব্যাপক প্রশংসা করছেন।

একই দিন ধানমন্ডিতে আরেক বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ইফতারেও যোগ দিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রতিনিধি দল। তারা এক টেবিলে ইফতার করেছেন। এদিন দুপুরে প্রথম আলোর ক্ষতিগ্রস্ত কার্যালয় পরিদর্শনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে গেছেন সারজিস আলমসহ এনসিপির নেতারা। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এমন আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ককে অনেকে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন।

অতীতের বৈপরীত্য ও বর্তমানের ব্যতিক্রম

বিশেষ করে অতীতে যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক 'সাপে-নেউলে'র মতো ছিল, সেখানে এবার এমন দৃষ্টান্তকে ব্যতিক্রম হিসেবেই মূল্যায়ন করছেন বিশ্লেষকরা। তবে রাজনীতিতে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক কতটা টেকসই হবে— সে প্রশ্নও তুলছেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এমন সম্পর্ক কতদিন থাকবে, তা নির্ভর করে সব পক্ষের ওপর। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যে কাজগুলো করছেন, এ ধরনের স্বাভাবিক শিষ্টাচার কতদিন থাকে সেটিও দেখার বিষয়। এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত কিছু বলা কঠিন।"

শপথের আগেই বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ

শপথের আগেই বিরোধী দলীয় তিন নেতার বাসায় যান প্রধানমন্ত্রী। সরকার গঠনের দুই দিন আগে দলের প্রধান হিসেবে রাজনীতির মাঠের প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রধানের বাসায় ছুটে যান তারেক রহমান।

১৫ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় প্রথমে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বসুন্ধরার বাসায় যান তিনি। সেখানে প্রায় পৌনে একঘণ্টা অবস্থান করেন তারেক রহমান। এ সময় জামায়াত আমিরের আপ্যায়ন গ্রহণ করেন তিনি। অত্যন্ত হৃদ্যতাপূর্ণ আলোচনা করেন তারা।

সেখান থেকে রওনা দিয়ে রাত সাড়ে ৮টায় আরেক বিরোধী নেতা নাহিদ ইসলামের বেইলি রোডের বাসায় যান তারেক রহমান। এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলির একটি স্টিলের তৈরি প্রতিকৃতি বিএনপির চেয়ারম্যানকে উপহার দেন নাহিদ। সেখানে দেশ গড়তে তরুণদের সহযোগিতা চান তারেক রহমান।

পরদিন (১৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় আরেক নেতা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের বাসায় যান বিএনপির চেয়ারম্যান। সেখানেও তিনি ইসলামি আন্দোলনের আমিরসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের সহযোগিতা চান। তারা তাকে গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের আশ্বাস দেন।

টেলিফোনে স্বাস্থ্য খোঁজ ও ইফতারে ঐক্য

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার এক সপ্তাহের মাথায় ২৫ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে গিয়ে তারেক রহমানকে ইফতারের আমন্ত্রণপত্র দেন জামায়াতের প্রতিনিধি দল। এ সময় তারা জানান, দলীয় আমির ডা. শফিকুর রহমান শারীরিকভাবে অসুস্থ। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করে খোঁজখবর নেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি তার সুস্থতা কামনা করেন।

সরকারপ্রধান হিসেবে শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) প্রধান বিরোধী দলের ইফতার মাহফিলে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে সরকার ও প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক টেবিলে পাশাপাশি বসে ইফতার করেছেন বিরোধী দলীয় নেতার সঙ্গে। তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।

ইফতারের আগে প্রতিক্রিয়ায় তারেক রহমান দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে রাজনৈতিক দলগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "বাংলাদেশের মানুষ আজকে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে, অনেক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আমাদের সবার দিকে তাকিয়ে আছে।"

এ সময় বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তারা গতানুগতিক বিরোধী দল হতে চান না। সংসদ কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী দলের পথচলায় সমন্বয় লাগবে। ক্ষমতাসীন দল সামনের চাকা হলে বিরোধী দল হবে পেছনের চাকা। তাই আমরা সেই পথচলায় সমন্বয় চাই এবং পারস্পরিক সম্মানের জায়গাটা চাই।

এনসিপির ইফতারে সম্প্রীতির বার্তা

রাজনৈতিক অঙ্গনে একে-অপরের কড়া সমালোচনা করলেও ২৮ অক্টোবর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ইফতারে যোগ দেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা। সেখানে রাজনৈতিক সম্প্রীতির কথা বলেন তারা। এর মধ্যে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম রবি ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন।

এছাড়া জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এবং আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর মঞ্জুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

সেখানে সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, "এনসিপির মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান দেশের রাজনীতিকে আরও গতিশীল ও সমৃদ্ধ করবে।" তার মতে, তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে মর্যাদাবান করবে এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আর নাহিদ ইসলামও দেশ গঠনে নিজেদের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। এজন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় কার্যকর করার আন্দোলন অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন।

উগ্রতার বিপক্ষে রাজনৈতিক ঐক্য

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর সংবাদ শুনে একদল যুবক দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ব্যাপক ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করে। সেই ধ্বংসস্তূপ ঘিরে শিল্পী মাহবুবুর রহমানের তৈরি করা 'আলো' শীর্ষক প্রদর্শনী দেখতে ২৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন।

তাদের সঙ্গেই যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। উভয় দলের নেতারাই এ ধরনের উগ্রতার বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। বিষয়টিকে এক ধরনের রাজনৈতিক ঐক্য হিসেবে মূল্যায়ন করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনীতিবিদদের মূল্যায়ন

নতুন সরকারের যাত্রার পর থেকে বিরোধী দলের সঙ্গে এখনও পর্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক নেতারা। তবে তাদের এ সম্পর্ক কতটুকু স্থায়ী হবে তা নিয়ে ভিন্ন বিশ্লেষণ তাদের।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "প্রাথমিকভাবে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে এক ধরনের সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। আমরা মনে করি, এটি ইতিবাচক। যা অতীতে খুব একটা দেখা যায়নি। মূলত এটি গণঅভ্যুত্থানের কারণে সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে সেটি সময়ই বলে দেবে।"

এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "আমরা চাই, সরকার ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করুক। বর্তমান সময়ের মতো ইতিবাচক ধারা কতটুকু টেকসই হবে, সেটা সরকারের ওপর নির্ভর করবে।"

"তবে বিরোধী দলের আসনে থেকে আমরা অবশ্যই গঠনমূলক দায়িত্ব পালন করবো," বলেন তিনি।

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, "তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করেছে দেশ ও জাতির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে। তিনি সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চান। সেক্ষেত্রে প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখার দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যে স্থাপন করেছেন তিনি। আশা করি, এ ধারা অব্যাহত থাকবে।"