স্বৈরাচার পতনের পর সংসদে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংস্কারের চ্যালেঞ্জ
স্বৈরাচার পতনের পর সংসদে গণতান্ত্রিক চর্চা ও সংস্কার

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মারুফুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, এই অধিবেশনটি স্বৈরাচারের পতন ও গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক চর্চার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে সংসদের ভেতরে জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংসদের প্রথম অধিবেশন: গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিফলন

কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, '২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এই সংসদের মাধ্যমে। এটি একটি বহুত্ববাদী পরিবেশ তৈরি করেছে, যা আগের একদলীয় আধিপত্যের বাইরে।' তবে তিনি উল্লেখ করেন, সংসদ সদস্যদের মধ্যে প্রথমবার সদস্য হওয়ার কারণে সংসদীয় আচরণের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কার্যপ্রণালি বিধির কঠোর প্রয়োগ ও সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এটি কেবল আনুষ্ঠানিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ঐকমত্যের চ্যালেঞ্জ

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারি দল ও বিরোধী জোটের মধ্যে দ্বিমত থাকলেও কাজী মারুফুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, 'জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নয়, এটি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তে লেখা একটি জাতীয় চুক্তি।' তিনি ঐকমত্যের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন, যা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুসারে গঠিত হবে এবং মৌলিক বিষয়ে ন্যূনতম সাধারণ ভিত্তি খুঁজে বের করবে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরকারের প্রথম তিন মাস: সাফল্য ও দুর্বলতা

সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হিসেবে কাজী মারুফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, 'একটি চরম ভঙ্গুর সময় পার করে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক চর্চার পথে শান্তিপূর্ণ যাত্রা নিশ্চিত করা।' এছাড়া নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করাকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তবে সরকারের প্রধান দুর্বলতা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতির অভাব। সম্প্রতি ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড ও মব-সহিংসতা এখনো চলমান রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা ও সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। জ্বালানি তেল নিয়ে তেলেসমাতি কাণ্ড সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে।

প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর আন্তরিকতা

প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের সদিচ্ছা থাকলেও মাঠপর্যায়ে বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য দেখার পুরোনো প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, 'পুলিশ ও সিভিল সার্ভিস–সংক্রান্ত আইনের আমূল সংস্কার করে একটি স্বাধীন, মেধাভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক বোর্ড গঠন না করা পর্যন্ত শুধু আন্তরিকতা দিয়ে দলীয় প্রভাব কমানো সম্ভব নয়।'

জনমনে আস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি

অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল শাসনামলের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় মানুষের মধ্যে প্রাথমিক স্বস্তি তৈরি হলেও তা আস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষয়ে যাচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং ভয়ের সংস্কৃতির অবসান মানুষকে আশাবাদী করেছে; কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম ও নিরাপত্তার অভাবে আস্থা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।

মব জাস্টিস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা

ধর্ষণের ঘটনায় মব জাস্টিস ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানোর প্রবণতাকে কাজী মারুফুল ইসলাম 'আমাদের সামাজিক ও আইনি কাঠামোর গভীরতম সংকটের ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ' হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, 'মব জাস্টিস কোনো বিচার নয়, এটি প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার এক সহিংস বিজ্ঞাপন।' তিনি ডিজিটাল অপরাধ দমনের আইনগুলোকে নারীদের বিরুদ্ধে হেট স্পিচ প্রতিরোধে কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানান।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: স্ট্যাগফ্লেশনারি ট্র্যাপ

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজী মারুফুল ইসলাম 'স্ট্যাগফ্লেশনারি ট্র্যাপ' বা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির সন্ধিক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করেন। এডিবি ও আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৭% এবং মূল্যস্ফীতি ৯.০৪% এর ওপরে। তিনি বলেন, 'বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ধীর হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেখতে চাইছেন।'

আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা

আন্তর্জাতিক চাপ ও যুদ্ধগুলো অনুঘটক মাত্র; আসল ক্ষত তৈরি করেছে অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম কম, মাত্র ৬.৬%। বিগত বছরগুলোর মেগা প্রজেক্টের জন্য নেওয়া বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ

আগামী সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় পর্যায়ে পেশিশক্তি ও একক দলের আধিপত্য রুখে দেওয়া। অতীতের স্থানীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যেন স্থানীয় প্রশাসন সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে।

উন্নয়ন মডেলের ঝুঁকি ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের প্রধান ঝুঁকি হলো ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা সুবিধাবাদী পুঁজিবাদ, যা প্রবৃদ্ধির নামে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করে। কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, 'প্রবৃদ্ধির সংখ্যা দিয়ে নয়, টেকসই ভবিষ্যৎ পরিমাপ করতে হবে শক্তিশালী, স্বাধীন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দিয়ে।' সম্ভাবনা তৈরি হবে যখন তরুণ জনগোষ্ঠীকে এআই, আইটি, ফ্রিল্যান্সিং এবং স্মার্টপ্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে বিনিয়োগের মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তর করা যাবে।

আগামী এক বছরের পূর্বাভাস

আগামী একটি বছর বাংলাদেশের জন্য 'মেক অর ব্রেক পিরিয়ড' হবে। রাজনৈতিকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার নিয়ে তীব্র দর–কষাকষি হবে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের স্থানীয় নির্বাচন যদি সুচারু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হয়, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে; অন্যথায় সহিংস মেরুকরণ হতে পারে। অর্থনীতিতে আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব ও কঠোর রাজস্ব নীতির কারণে আগামী ছয় মাস মূল্যস্ফীতির চাপ বজায় থাকবে। তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ উদ্ধার ও পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে অগ্রগতি হলে আগামী বছরের শেষ ভাগে সামষ্টিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করবে।