সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি উপবৃত্তির তালিকা ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, মাগুরা-২ নির্বাচনী এলাকায় সরকারি বৃত্তির সব সুবিধাভোগীই হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং একজন মুসলিম শিক্ষার্থীও এই তালিকায় নেই। এ দাবিকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বৈষম্যের অভিযোগ তুলে শতাধিক ফেসবুক পেজ, গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একই ধরনের পোস্ট, ফটোকার্ড ও মন্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও দাবি করা হচ্ছে, ‘শুধু হিন্দুরাই বৃত্তি পেয়েছে’। আবার কোথাও বিষয়টিকে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে যুক্ত করে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ভাইরাল তালিকাটি কী?
যাচাই করে দেখা যায়, ভাইরাল তালিকাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির নয়; এটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ‘বিশেষ এলাকার জন্য উন্নয়ন সহায়তা (পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত)’ কর্মসূচির আওতায় সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য প্রস্তুত করা উপবৃত্তির তালিকা।
সংশ্লিষ্ট কি–ওয়ার্ড সার্চ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক সায়মা আক্তারের স্বাক্ষরিত ১ এপ্রিলের এক বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পাওয়া গেছে, তা থেকে জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ব্যতীত দেশের অন্যান্য এলাকায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য এই কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দরিদ্র ও অসহায় পরিবার ও শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা বৃত্তি, বসতঘর, বাইসাইকেল ও সেলাই মেশিনসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়। এই কর্মসূচি নতুন নয়। ১৯৯৬ সালে চালু হওয়া এই সরকারি কর্মসূচির অধীনে প্রতি অর্থবছরে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থী ও পরিবারের জন্য শিক্ষা বৃত্তি, শিক্ষা উপকরণ, বাইসাইকেল, সেলাই মেশিন, ঘরসহ বিভিন্ন সহায়তা প্রদান করা হয়।
তালিকায় ‘বিশ্বাস’ ও ‘রায়’ পদবি কেন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, তালিকায় ‘বিশ্বাস’, ‘রায়’ সহ বিভিন্ন পদবি থাকায় কীভাবে তারা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মাগুরার শালিখা উপজেলায় ‘বাগদী’ স্বীকৃত ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন।
এ বিষয়ে তালখড়ি ইউনিয়নের আদিবাসী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মঙ্গল রায় প্রথম আলোকে বলেন, শালিখার উপবৃত্তির তালিকায় থাকা ‘রায়’ ও ‘বিশ্বাস’ পদবিধারীরা আসলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ‘বাগদি সম্প্রদায়ের’ অন্তর্ভুক্ত। তাদের এলাকায় ছোটবেলা থেকেই তাদের পাড়াকে ‘বাগদি পাড়া’ বলা হতো এবং রায় ও বিশ্বাস তাদের দীর্ঘদিনের বংশগত পদবি। মঙ্গল রায় জানান, শালিখার উপজেলার উপবৃত্তির ওই তালিকায় যারা আছে, তারা সবাই বাগদি সম্প্রদায়ের। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী হিসেবে এই সরকারি সুবিধা পাচ্ছে তারা।
যাচাইয়ে দেখা যায়, বাগদি সম্প্রদায় সরকারি তালিকায় থাকা ৫০টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী গবেষক মেসবাহ কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ভারতে বাগদি সম্প্রদায় শিডিউল কাস্ট হিসেবে স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশে সেই ধরনের কোনো শ্রেণিবিন্যাস নেই। তবে বাংলাদেশ সরকার সরকারি গেজেটের মাধ্যমে ৫০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সেই তালিকায় বাগদি সম্প্রদায়ও রয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য
মাগুরার শালিখার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর হাসান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এভাবে প্রতিবছরই বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই শিক্ষার্থীরা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জনসংখ্যার তথ্যের ভিত্তিতে (আদমশুমারি অনুযায়ী শালিকা উপজেলায় ৩৪৩০ জন) ১ম-৫ম শ্রেণিতে ৩২ জন, ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণিতে ২৫ জন, এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণিতে ৭ জনসহ মোট ৬৪ জনকে শিক্ষাবৃত্তির জন্য নির্বাচিত করা হয়। তানভীর হাসান চৌধুরী বলেন, শালিখা উপজেলায় শুধু বাগদী জাতিগোষ্ঠীর মানুষ থাকায় তাঁদেরই সুবিধাভোগী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে এবং এর আগেও এই জাতিগোষ্ঠীর ব্যক্তিরাই শুধু সহায়তা পেয়েছিলেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, এখানে ধর্মীয় বিবেচনায় কাউকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বা বাদ দেওয়া হয়নি। আর এটা উপজেলা প্রশাসনের নিয়মিত কাজের অংশ এবং এর সঙ্গে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
মাগুরার জেলা প্রশাসক মোতাকাব্বীর আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তালিকা তৈরি করা হয়। যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর জাতিগোষ্ঠীগত পরিচয় নিশ্চিত হতে ওই সম্প্রদায়ের নেতাদের প্রত্যয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন ছাড়াও এটি বাছাইয়ের জন্য প্রতি উপজেলায় একটি নির্দিষ্ট কমিটি এগুলো যাচাই করে থাকে। মোতাকাব্বীর আহমেদ বলেন, ‘শালিখায় যে তালিকা ছড়ানো হয়েছে, সেটা তৈরিতে কোনো অনিয়ম নেই। এখানে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর তালিকায় তো অন্য সম্প্রদায়ের লোকজনের থাকার সুযোগ নেই। এটি যারা ছড়িয়েছে, তাঁদের রাজনৈতিক বা ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।’
উপসংহার
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত উপবৃত্তির তালিকাটি সাধারণ শিক্ষার্থীদের নয়, বরং সমতলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীভুক্ত শিক্ষার্থীদের জন্য দীর্ঘদিনের সরকারি কর্মসূচির অংশ। তাই ‘শুধু হিন্দুরাই বৃত্তি পেয়েছে’, ‘মুসলিমদের বঞ্চিত করা হয়েছে’ কিংবা ‘ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তালিকা তৈরি করা হয়েছে’—এ ধরনের দাবি তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট গোপন করে প্রচার করা হয়েছে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।



