দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারপ্রধানের করণীয়: অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ
দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারপ্রধানের করণীয় ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

দুর্নীতি: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান অন্তরায়

দুর্নীতিকে অর্থনীতিবিদরা আমলাতান্ত্রিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে, মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান এটিকে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দেখে। যেভাবেই দেখা হোক, দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব। উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে নতুন রাষ্ট্রে দুর্নীতি থাকলেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সুশাসনের অভাব দূরীভূত হয়। উন্নয়নের ইতিহাস এই সত্যকেই সমর্থন করে।

দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি

ডাচ বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ দার্শনিক বার্নার্ড ম্যান্ডেভিল বলেছেন, একজন দক্ষ ও সৎ রাজনীতিকের হাতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পড়লে ব্যক্তির অসততাকে কখনো কখনো সমষ্টির জন্য হিতকর করা যায়। প্রথম আলোতে প্রকাশিত সৌমিত জয়দ্বীপের নিবন্ধ ‘তারেক রহমানের সামনে “স্টেটসম্যান” হওয়ার সুযোগ এসেছে’ এই তত্ত্বেরই প্রতিধ্বনি।

ইতালীয় অর্থনীতিবিদ মাওরো পাওলো ১৯৯৫ সালে তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘করাপশন অ্যান্ড গ্রোথ’-এ বাংলাদেশের উদাহরণ টেনেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি হারাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশে দুর্নীতি না থাকলে প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ হতে পারত। সুতরাং, দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

দুর্নীতির মূল কারণসমূহ

দুর্নীতির কারণগুলো সরকারপ্রধানের বুঝতে হবে। কারণ জানা গেলে প্রতিকারও বের করা সম্ভব। মাত্রাতিরিক্ত রেগুলেশন বা আইনকানুন দুর্নীতির একটি প্রধান কারণ। রেগুলেশন যত বেশি হবে, আমলাদের ঘুষ নেওয়ার সুযোগ তত বেশি সৃষ্টি হবে। বিশ্বব্যাংক ‘একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো কতটা সহজ’—এমন একটি সূচক প্রকাশ করে, যেখানে দুর্নীতির মাত্রা প্রতিফলিত হয়।

মালয়েশিয়া গত চার দশকে ব্যবসা-বাণিজ্যে অভূতপূর্ব উন্নতি করেছে। সহজের হিসাবে ১৯০টি দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ার অবস্থান ১২, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮। তাই সরকারকে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য রেগুলেশন কমাতে হবে।

সরকারপ্রধান ও দলের লক্ষ্যের পার্থক্য

সরকারপ্রধানের ও ক্ষমতাসীন দলের অন্য সদস্যদের লক্ষ্য সাধারণত ভিন্ন হয়। কারণ, সরকারপ্রধানের স্টেটসম্যান হওয়া বা ইতিহাসে স্থান লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে। অন্যদিকে দলের অন্যদের লক্ষ্য অর্থ উপার্জন বা ক্রমাগত ক্ষমতায় থাকা। এই কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট দুর্নীতি রোধের একটি প্রধান উপায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, আমলা বা রাজনীতিবিদদের হাতে বিবেচনা করার ক্ষমতা, অর্থাৎ ডিসক্রিয়েশনারি পাওয়ার দেওয়া মানে তাঁদের দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেওয়া। এই ক্ষমতা আইনপ্রণেতাদের হাতে থাকতে হবে, সংসদে ব্যাপক আলোচনা এবং এই আলোচনার আগে সংসদীয় কমিটিকে সংশ্লিষ্ট সব পার্টির কথা শুনতে হবে।

সরকারের আকার ও ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ

সরকারের আকার যত ছোট এবং ক্ষমতা যত বিকেন্দ্রীকৃত হবে, দুর্নীতির সুযোগ তত কমে যাবে। বিশেষ করে সরকারি ব্যয় বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে গেলে, দুর্নীতি অনেকটাই কমে যাওয়ার কথা। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত সরকার ব্যয় কমানোর ব্যাপারটা আমলে নিয়েছে বলে মনে হয়।

মন্ত্রণালয় বা বিভাগ একীকরণ করে আকার ছোট করা, ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি কেনা স্থগিত করা ও সরকারি প্লট না নেওয়ার উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কিন্তু এতগুলো উপদেষ্টা নিয়োগ, তাঁদের বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা দেওয়া কৃচ্ছ্রসাধন নীতির পরিপন্থী।

দুর্নীতির অর্থনৈতিক প্রভাব

দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিক ও আমলা রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে নিয়ে যান, যেখানে তাঁদের অর্থ আত্মসাৎ করার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলা ও তাঁদের অদক্ষতার কারণে রাষ্ট্রকে প্রতিবছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার গচ্চা দিতে হচ্ছে।

এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংকও প্রায় একই মত প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, দুর্নীতির কারণে অনুৎপাদনশীল খাতে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ চলে যাওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধের উপায়

প্রেস ও মিডিয়ার স্বাধীনতা ও একটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধ অসম্ভব। শ্রমের বাজারে, পার্লামেন্টে ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য বিভাগে নারীর ব্যাপক অংশগ্রহণ দুর্নীতি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

সরকারপ্রধানের জন্য কার্যকর টুল তথা দুর্নীতি রোধের উপায় হলো:

  1. মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, পুলিশ বিভাগ, বিচার বিভাগ ইত্যাদির নিয়োগ স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা।
  2. সব সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান বিরোধী দল থেকে করা।
  3. বিরোধী দল, মিডিয়া, পুলিশ, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন পূর্ণ শক্তি নিয়ে স্বাধীনভাবে যাতে আবির্ভূত হতে পারে, তার ব্যবস্থা করা।

এটা করা গেলে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করবে এই পদক্ষেপ। কারণ, এই ব্যবস্থা শুধু ক্ষমতাসীন রাজনীতিক ও আমলাদের দুর্নীতিই রোধ করবে না, রাষ্ট্রে ‘চেকস অ্যান্ড ব্যালান্সেস’-এর কাজও করবে।

রাজনীতিকে বিশুদ্ধ রাখার আহ্বান

সরকারপ্রধানের একটি লক্ষ্য থাকতে হবে, রাজনীতিকে বিশুদ্ধ রাজনীতিকদের হাতে রাখতে। ধনিক ব্যবসায়ী শ্রেণির হাতে রাজনীতি থাকলে কোনোভাবেই জনকল্যাণ সর্বাধিক করা যাবে না। সমাজে কিছু মানুষ আছেন, জনকল্যাণের প্রতি যাঁদের একটি গভীর প্রেষণা, যাঁরা পরার্থে জীবন যাপন করেন এবং রাজনীতিকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। সরকারপ্রধানের কর্তব্য খুঁজে খুঁজে তাঁদের হাতে রাজনীতি অর্পণ করা।

রাজনীতি এখন টাকার খেলা। অতএব, টাকা ছাড়া নির্বাচিত হওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে, এই প্রকৃত রাজনীতিকদের দল থেকে অর্থ জোগান দিতে হবে। রাজনীতিক সাধারণ জীবন যাপন করবে এবং দেশ সেবার আনন্দ ও জনগণের কাছ থেকে প্রাপ্ত ভক্তি উপভোগ করবেন।

প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা

দুর্নীতির সঙ্গে প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে অর্থনীতিতে ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। দুর্নীতি রোধ করতে চাইলে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পূর্ণ স্বাধীন করতেই হবে। বিশেষ করে, পুলিশ যে একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান, তা এ দেশের মননে আর কাজই করে না।

সরকার নিজের স্বার্থে পুলিশ ব্যবহার করলে কখনোই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। পুলিশ বিভাগের ও তদন্ত সংস্থাগুলোর নিয়োগপ্রক্রিয়াও হতে হবে স্বচ্ছ ও পক্ষপাতহীন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে ‘যত অন্যায়ই করি না কেন, কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যাওয়া যাবে’—এই ধারণার অবসান ঘটানো অত্যন্ত জরুরি।

শুধু দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীই নয়, সমাজের যেকোনো অসৎ ব্যক্তি এবং অবৈধ উপায়ে অর্থ উপার্জন করে ব্যক্তি খাতের এমন ব্যবসায়ী—সবাইকে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে। সরকারপ্রধানও সমাজেরই একজন। অতএব, তাঁকেও এই একই নিয়ম মেনে চলতে হবে। অতীতে যাঁরা দুর্নীতি বা অপরাধ করেছেন, তাঁদের কোনোভাবেই আর কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব দেওয়া যাবে না। দিলে, সমাজে ও রাষ্ট্রে দুর্নীতি থাকবে—কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না।