চট্টগ্রাম কাস্টমসে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার: ৩৮ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে দুদকের মামলা
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে প্রায় ৩৮ কোটি ৮৬ লাখ ৪৮ হাজার ১৪৭ টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি দায়ের করেন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এর সহকারী পরিচালক ধীরাজ চন্দ্র বর্মন।
মামলার আসামি ও অভিযোগের বিবরণ
মামলার বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেন দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর উপসহকারী পরিচালক আপেল মাহমুদ বিপ্লব। মামলার আসামিরা হলেন:
- হাসান শরিফ (৬২)
- জিয়া উদ্দিন (৪৫)
- খাজা শাহাদতউল্লাহ (৫৪)
- জিয়াউর রহমান (৪৮)
- আদিল রিজওয়ান (৪১)
- খায়রুজ্জামান (৪৬)
- শহিদুল হক (৫৭)
- হাসান শাহীন (৫০)
- দীপান্বিতা বড়ুয়া (৬৯)
- সুরীত বড়ুয়া (৭০)
দণ্ডবিধির ৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪২০/১০৯ ধারায় জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস, এবং ঘটনার সময়কাল ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত।
বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের পদ্ধতি
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ-তাইওয়ান সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামে একটি শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার আওতায় চীন থেকে টাইলস আমদানি করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালে বন্ড লাইসেন্স নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে। নিয়ম অনুযায়ী, আমদানিকৃত কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে শতভাগ রফতানি করার কথা থাকলেও, দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে যে, ২০১৩ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত ৬২টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ২২ হাজার ৯৪৩ দশমিক ৬৫ মেট্রিক টন সম্পূর্ণ প্রস্তুতকৃত টাইলস ‘আনফিনিশ’ ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হয়েছিল।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর প্রতিষ্ঠানটির একটি চালান খালাস স্থগিত করে কায়িক পরীক্ষা ও নমুনা সংগ্রহ করে। পরে নমুনা পরীক্ষার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) গ্লাস অ্যান্ড সিরামিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পাঠানো হলে, বিশেষজ্ঞ মতামতে পণ্যগুলো ফিনিশড টাইলস বলে প্রতীয়মান হয়।
রফতানিতে জালিয়াতির প্রমাণ
দুদকের অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, প্রতিষ্ঠানটি ৮০টি বিল অব এক্সপোর্টের মাধ্যমে রফতানি দেখালেও, সংশ্লিষ্ট অফডক প্রতিষ্ঠান ও শিপিং এজেন্টরা এসব বিল অব লেডিং (বিএল) জাল বলে নিশ্চিত করে। গোল্ডেন কন্টেইনার ও ইনকন্ট্রেড লিমিটেড জানায়, তাদের মাধ্যমে কোনও রফতানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়নি। একইভাবে সংশ্লিষ্ট শিপিং এজেন্টরাও বিএল ইস্যু না করার কথা জানায়।
এ ছাড়া, চালান পরীক্ষণকারী দুই রাজস্ব কর্মকর্তার সই জাল করা হয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বন্ড কমিশনারেটের অডিট রিপোর্টে বিভিন্ন সময়ে আমদানি করা টাইলসের মজুতে গরমিল এবং স্থানীয় বাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আসামি ও ভবিষ্যৎ তদন্ত
এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ট্রিপল এন্টারপ্রাইজের মালিকসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুদক জানিয়েছে, তদন্তে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই মামলাটি শুল্ক ফাঁকি ও বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক অপরাধ দমনে দুদকের সক্রিয় ভূমিকা তুলে ধরে।
