ঢাকায় ময়লা বিলে অনিয়ম: নির্ধারিত ফি ১০০ টাকা, আদায় ৩০০ টাকা
ঢাকায় ময়লা বিলে অনিয়ম: নির্ধারিত ফি ১০০, আদায় ৩০০

মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ আবাসিক এলাকায় প্রতি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ময়লার বিল নেওয়া হয় ১৫০ টাকা, যা গত ডিসেম্বরেও ছিল ১০০ টাকা। লালমাটিয়ায় কোথাও নেওয়া হয় ২৫০ টাকা, কোথাও ৩০০ টাকা। মিরপুরের বিভিন্ন সেকশনে ফ্ল্যাট প্রতি ১০০–১৫০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। শেওড়াপাড়ায় প্রতি ফ্ল্যাটের জন্য দিতে হয় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।

অন্যদিকে গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় ময়লার বিলের পরিমাণ আরও বেশি। এসব এলাকার বড় হোটেল-রেস্তোরাঁর মালিকদের মাসে দিতে হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। ঢাকা উত্তর সিটির একেক এলাকায় এই বিল একেক রকমের। যদিও সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, ময়লার বিল মাসে ১০০ টাকার বেশি হবে না। কিন্তু যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই বিল আদায় করছে।

ঢাকা উত্তর সিটিতে ওয়ার্ড আছে ৫৪টি। এর মধ্যে ১ থেকে ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে গৃহস্থালির বর্জ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশন নির্ধারিত মাসিক ফি ১০০ টাকা। বাকি ১৮টি ওয়ার্ডের (৩৭-৫৪) ক্ষেত্রে ৫০ টাকা। এসব ওয়ার্ড (উত্তরখান-দক্ষিণখান, বাড্ডাসহ বিভিন্ন এলাকা) ২০১৬ সালের জুন মাসে সিটি করপোরেশনে যুক্ত হয়। নতুন ওয়ার্ডগুলোতেও বাসাবাড়ির ময়লার বিল ৫০ টাকার বেশি নেওয়া হয়। যেমন দক্ষিণখানে (৪৮ নম্বর ওয়ার্ড) নেওয়া হয় মাসে ১৫০-২০০ টাকা। আবার ভাটারার বারোবিঘা এলাকায় (৪০ নম্বর ওয়ার্ড) ফ্ল্যাটপ্রতি নেওয়া হয় ১০০ টাকা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি কীভাবে হয়, কোন এলাকায় কত টাকা বিল নেওয়া হয়, কারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত, রাজনৈতিক নেতাদের সম্পৃক্ততা কতটা আছে—এসব বিষয়ে জানতে গত ২০ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত ২১ দিন ঢাকা উত্তর সিটির ২৬টি ওয়ার্ড ঘুরেছেন এই প্রতিবেদক। এই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা, সিটি করপোরেশনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা, ময়লা সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত কর্মী ও ভ্যানচালকদের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। এ ছাড়া ২৬টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে অন্তত দুজন করে বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনেক এলাকায় বাসাবাড়ি থেকে ইচ্ছেমতো ময়লার বিল আদায়ের বিষয়ে অবগত আছেন বলে প্রথম আলোকে জানান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, কারও কাছ থেকে অভিযোগ পেলে ব্যক্তিগতভাবে হস্তক্ষেপ করে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেন তিনি।

প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, যে যার মতো করে পেশিশক্তির মাধ্যমে হোক বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে হোক, একটা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সিটি করপোরেশনের আওতায় নিয়ম ও শর্ত মেনে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি শুরু করা গেলে বিশৃঙ্খলা কমে আসবে। বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করার বিষয়টি নিয়ে আদালতে একটি পক্ষ রিট করেছে। রিটকারী পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে। তখন ময়লা সংগ্রহের কাজটি একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। এটি করা গেলে বিশৃঙ্খলা থাকবে না।

আওয়ামী লীগ (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের শাসনামলে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করতেন দলটির নেতা-কর্মীসহ তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলররা। এ নিয়ে ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর প্রথম আলোয় ‘রাজধানীতে ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীবাসীকে জিম্মি করে বছরে অন্তত ৪৫০ কোটি টাকার ময়লা-বাণিজ্য করছেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও স্থানীয় কাউন্সিলরদের লোকজন। সেদিন প্রথম পাতার পাশাপাশি ভেতরের পাতাতেও একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদনেও ময়লা-বাণিজ্যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার বিষয়টি উঠে আসে।

গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। এখন ময়লা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন দলটির কিছু নেতা-কর্মী।

চাঁদা নেওয়ার লোক পাল্টেছে

ঢাকা উত্তর সিটির আওতাধীন মোহাম্মদপুর এলাকায় ওয়ার্ড রয়েছে ৬টি (২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪)। এর মধ্যে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে (রায়েরবাজার, পশ্চিম ধানমন্ডি, জাফরাবাদসহ কিছু এলাকা) ১৯৯৭ সাল থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করেন ব্যবসায়ী শান্তি রিবারু। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম গ্রামীণ এন্টারপ্রাইজ। মূলত এই প্রতিষ্ঠান ভ্যানে করে বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ করে।

ব্যবসায়ী শান্তি রিবারু প্রথম আলোকে বলেন, আগে চাঁদা দিতে হতো আওয়ামী লীগের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মোহাম্মদ হোসেনকে। এখন দিতে হচ্ছে অন্যদের। তবে এখন কারা চাঁদা নেয়, এই প্রশ্নের জবাব দিতে রাজি হননি তিনি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০২০ সালে ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর হন সলিম উল্লাহ্ ওরফে সলু। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল স্বপ্ন মানবিক কল্যাণ সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ ও বিল তোলার কাজ করতেন। এর আগে এই ওয়ার্ডে ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর শাহীন আক্তার। সলু কাউন্সিলর হয়েই প্রভাব খাটিয়ে নিজ দলের আরেক কাউন্সিলরের কাছ থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজটি নিয়ে নেন।

মোহাম্মদপুর থানা এবং ওয়ার্ড বিএনপির তিনজন নেতা ও সিটি করপোরেশনের মাঠপর্যায়ের চারজন কর্মকর্তার সঙ্গে ময়লা-বাণিজ্যের নেপথ্যে কারা, এ নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে এখন ময়লার কাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন মোহাম্মদপুর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান (ইমন মুন্সী)। পাশের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লার কাজ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সজিব আহমেদ। ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজটি করেন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ হোসেন মোড়ল।

ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার যে অভিযোগ উঠেছে, সে প্রসঙ্গে মোহাম্মদপুর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ভবিষ্যতে মোহাম্মদপুরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রার্থী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে প্রতিপক্ষ মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাঁর দাবি, এই ওয়ার্ডে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি করছেন আগের লোকেরা, তাঁরা এখন বিএনপি নেতা সেজেছেন।

অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাহিদ হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা আগে করত, তারাই এখনো করে। আমি নিয়ন্ত্রণ করি বা চাঁদা আমাকে দেওয়া হয়, এমন কিছুই না।’

মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়া, স্যার সৈয়দ রোড, হুমায়ুন রোড, বাবর রোড, ইকবাল রোডসহ আরও কিছু এলাকা নিয়ে ৩২ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাসা থেকে ২৫০-৩০০ টাকা বিল নেওয়া হয়। আগে নেওয়া হতো ২০০-২৫০ টাকা। এই ওয়ার্ডে ময়লার কাজ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া জাহিদকে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে গত বছরের ৩ জুলাই যুবদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ২২ জানুয়ারি তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সময়ে ১৬টি ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান (ময়লা সংগ্রহকারী) কাজ করত। বিনিময়ে এই ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর আসিফ আহমেদকে চাঁদা দিতে হতো। এখনো ওই প্রতিষ্ঠানগুলোই কাজ করে। তবে এখন চাঁদা দিতে হয় অন্যদের।

১৬টি ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪টির মালিকের সঙ্গে ৫ মে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা কেউ নাম উদ্ধৃত হয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। এর মধ্যে তিনজন মালিক জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুরের চিহ্নিত শীর্ষ তিন সন্ত্রাসী—পিচ্চি হেলাল, কিলার বাদল ও এক্সেল বাবুকে চাঁদা দিতে হয়। তবে মাসে চাঁদার পরিমাণ কত, সে বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি তাঁরা।

আরেকটি ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের মালিকও চাঁদা দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে কাকে চাঁদা দিতে হয়, সেটি তিনি বলতে চাননি।

চাঁদা দিয়ে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজে যুক্ত ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের তিনজন মালিকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলেন, উত্তর সিটির বেশির ভাগ ওয়ার্ডে পাঁচ–ছয়টি ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান ময়লা সংগ্রহের কাজ করে। চাঁদাসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিলেও একটি প্রতিষ্ঠানের লাভ হয় মাসে দেড়-দুই লাখ টাকা। আর কেউ যদি এককভাবে পুরো ওয়ার্ডে এই কাজ করতে পারে, তাহলে লাভ মাসে ১৪-১৫ লাখ টাকা। আর ১৯ নম্বরের মতো অভিজাত ওয়ার্ডে (গুলশান-বনানী এই ওয়ার্ডের আওতাধীন) এককভাবে কেউ কাজটি করতে পারলে সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে লাভ থাকবে ৫০ লাখ টাকার বেশি।

সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তরে হোল্ডিং (ভবন/ফ্ল্যাট) আছে ৩ লাখ ৪২ হাজার ৬৮৮টি। প্রতি হোল্ডিং থেকে গড়ে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হলে মাসে ময়লা-বাণিজ্য থেকে আয় কমপক্ষে ৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। কোথাও কোথাও ছয় থেকে আটটি ফ্ল্যাট নিয়ে যে ভবন, সেই ভবনেরও হোল্ডিং নম্বর একটিই থাকে। আবার কোথাও কোথাও একটি ফ্ল্যাটেই একটি হোল্ডিং হয়। সিটি করপোরেশনে সাধারণত একটি হোল্ডিংয়ে ছয়টি ফ্ল্যাট থাকে—এভাবে হিসাব করে। সেটি বিবেচনায় নিলে ঢাকা উত্তরে ফ্ল্যাট আছে ২০ লাখ ৫৬ হাজার ১২৮টি। প্রতি ফ্ল্যাটের জন্য গড়ে ১৫০ টাকা করে নেওয়া হলে ময়লা-বাণিজ্য থেকে মাসে আয় কমপক্ষে ৩০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বছর হিসাবে যা কমপক্ষে ৩৭০ কোটি টাকা।

‘অদৃশ্য শক্তির’ বাধা

গুলশানে গুলশান-১ ও ২ নম্বর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব গুলশান সোসাইটির। এই দায়িত্ব সোসাইটিকে দিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে দায়িত্ব পেলেও ‘অদৃশ্য শক্তির’ বাধায় বাসাবাড়ি থেকে ভ্যানের মাধ্যমে ময়লা সংগ্রহের কাজটি নিজেদের আওতায় নিতে পারেনি সংগঠনটি।

রাজধানীর অভিজাত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশান-১ ও ২ নম্বর এলাকায় মোট ১৪৩টি সড়ক আছে। এর মধ্যে গুলশান সোসাইটির আওতায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ হচ্ছে মাত্র ২৪টি সড়কে (১১৬-১৪০ নম্বর সড়ক)। বাকি ১১৯টি সড়কের পাশের বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।

গুলশান থানা বিএনপির দুজন প্রভাবশালী নেতা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেছেন, গুলশান-২ নম্বর এলাকার ২১-৪২ নম্বর সড়কের বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ করেন থানা বিএনপির সদস্যসচিব শাহজাহান কবিরের অনুসারীরা।

তবে শাহজাহান কবির প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি এসবের সঙ্গে জড়িত না। আমি জানিও না, সত্যি কথা। এগুলো করে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দল ও অন্য নেতারা।’

বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজে যুক্ত ভ্যান সার্ভিসের কর্মী ও গুলশান থানা বিএনপির দুজন নেতার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪৩-৫০ নম্বর সড়কে ময়লা সংগ্রহের কাজটি নিয়ন্ত্রণ করছেন ১৯ নম্বর ওয়ার্ড পূর্ব (গুলশান) যুবদলের সভাপতি রাজু আহমেদ। ৫১-৭০ নম্বর সড়ক এলাকায় ময়লা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন গুলশান থানা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আনিসুর রহমান। ৭১-৯২ নম্বর সড়কে ময়লার কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন গুলশান থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দীন আহমেদ। ৯৩-১০৪ নম্বর সড়কে ময়লার কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শরিফ উদ্দিন। আর ১০৫-১১৫ নম্বর সড়কে ময়লার কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন গুলশান থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এ মামুনের অনুসারীরা।

তবে গুলশান থানা বিএনপির আহ্বায়ক এস এ মামুন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কোনো ছেলেপেলে, বিএনপির কোনো ছেলেপেলে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট নয়।’

কোন সড়কের ময়লা-বাণিজ্য কার নিয়ন্ত্রণে, প্রথম আলোর অনুসন্ধানে আসা নামগুলো পরে মুঠোফোনে জানানো হয় এস এ মামুনকে। তখন তিনি বলেন, ‘যারা আসলে এই কাজ করছে, তাদের নামই আসেনি। এসব কাজ গুলশান থানা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক জাকির হোসেন ও থানা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম করে। তাদের সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’

এরপর জাকির হোসেন ও শফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক। এর মধ্যে জাকির হোসেন ১০ মে প্রথম আলোকে বলেন, ‘হয়তো তাঁর সঙ্গে আমার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকতে পারে, তাই তিনি আমার নাম বলেছেন।’ এটুকু বলার পরই তিনি মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

অন্যদিকে শফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, গুলশানের কিছু সড়কের বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ তাঁরা করেন। ছয়-সাতটি সড়কের বেশি হবে না।

গত বছরের আগস্ট মাসে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার পর বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ ওই বছরের ১১ নভেম্বর থেকে শুরু করে গুলশান সোসাইটি। এই সোসাইটির সভাপতি ওমর সাদাত প্রথম আলোকে বলেন, অদৃশ্য শক্তির বাধা কাটিয়ে যখন পুরো গুলশানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ সোসাইটির হাতে আসবে, তখন সেই বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হবে।

উত্তরার ১৪টি সেক্টরে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজটি হয় সেখানকার বিভিন্ন সেক্টর কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে। উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম ভূঞা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের সেক্টরে প্রতি ফ্ল্যাট থেকে মাসে ২৫০ টাকা সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ময়লার বিল, মশার ওষুধ ছিটানো ও নিরাপত্তা প্রহরীর বেতনসহ অন্যান্য পরিচ্ছন্নতা কাজের ফি যুক্ত আছে।

চাঁদা আরও বাড়ানোর দাবি

আগারগাঁও (একাংশ) এলাকায় দীর্ঘ সময় ময়লা সংগ্রহের কাজ করত এ টু জেড মিডিয়া অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টার। তবে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিটি নির্বাচনের পর আগারগাঁও এলাকার (২৮ নম্বর ওয়ার্ড) কাউন্সিলর হন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ফোরকান হোসেন। এর পরের মাসেই ফোরকানের ছোট ভাই আসাদুজ্জামান আগারগাঁও এলাকার ময়লা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেন।

এ টু জেড মিডিয়া অ্যান্ড সোশ্যাল সার্ভিস সেন্টারের মালিক নাজমুল হক ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আবার আগারগাঁওয়ে বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। তবে কাজটি করতে হচ্ছে স্থানীয় যুবদল নেতাদের চাঁদা দিয়ে।

নাজমুল হক প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন থেকেই তিনি আগারগাঁও এলাকার বাসাবাড়ি থেকে ময়লার কাজ শুরু করেন। কিন্তু কাজ শুরুর এক সপ্তাহ পর তাঁকে ফোন করে মোহাম্মদপুরে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের এক নেতার কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে যুবদলের আরও কয়েকজন ছিলেন। তাঁকে বলা হয়, প্রতি মাসে স্থানীয় যুবদল নেতাদের চাঁদা দিতে হবে। তাঁকে এখন প্রতি মাসে চাঁদা দিয়েই কাজ করতে হচ্ছে।

চাঁদা কারা নিচ্ছেন এবং মাসে কত টাকা দিতে হচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে নাজমুল হক বলেন, যুবদলের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান পাঁচজনকে চাঁদা দিতে হয়। তিনি যে টাকা চাঁদা দিচ্ছেন, তাতে ওই নেতারা সন্তুষ্ট নন। মাসিক চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে বলা হয়েছে। আর না দিলে ময়লার কাজ দখলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তাঁরা।

চাঁদা না পেয়ে দখল

বিমানবন্দর থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশের সড়কে থাকা বিভিন্ন বিপণিবিতান ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থেকে ময়লা সংগ্রহের কাজ করত ইনোভেশন ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস। গত বছরের অক্টোবরে ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের ময়লা সংগ্রহের কাজে বাধা দেন কিছু যুবক। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মতিউর রহমান খানকে ফোনে বলা হয়, সাজ্জাদ নামের একজনের সঙ্গে দেখা করতে।

মতিউর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, ময়লার কাজে বাধা দেওয়া লোকটি উত্তরা পূর্ব থানা ছাত্রদলের সভাপতি এম সাজ্জাদ হোসেন। তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি। পরে তাঁর লোকজন প্রতি মাসে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানাই। এরপর মহাসড়কের পূর্ব পাশে ময়লার কাজের নিয়ন্ত্রণ জোর করে নিয়ে নেন সাজ্জাদের লোকজন।’

অভিযোগের বিষয়ে উত্তরা পূর্ব থানা ছাত্রদলের সভাপতি এম সাজ্জাদ হোসেনের বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে ১০ মে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেছে প্রথম আলো; কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। পরে তাঁর মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। সেই বার্তায় তাঁর কাছে ফোন দেওয়ার কারণ উল্লেখ করা হয়। তিনি প্রশ্নের জবাব দেননি।

সিটি করপোরেশনের কী করছে

২০০৯ সালে যখন ঢাকা সিটি করপোরেশন অবিভক্ত ছিল, তখন বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহের মাসিক ফি ছিল সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। ২০১১ সালে অবিভক্ত সিটি করপোরেশন ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণে বিভক্ত হয়। এরও প্রায় এক দশক পর ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবার ঢাকা উত্তর সিটির একটি বোর্ড সভায় ময়লা সংগ্রহের মাসিক ফি নির্ধারণ করা হয়। তখন কিছু এলাকায় মাসে ১০০ টাকা এবং কিছু এলাকায় ৫০ টাকা নেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন হয়। তবে বাস্তবে এই ফি কখনোই কার্যকর করা যায়নি।

পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের জন্য একটি নির্দেশিকা (টার্মস অব রেফারেন্স) তৈরি করে উত্তর সিটি। নির্দেশিকায় ঢাকা উত্তরের ৫৪টি ওয়ার্ডকে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তখন পুরোনো ১-৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ময়লার বিল ১০০ টাকা এবং নতুন যুক্ত ৩৭-৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিল ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

নির্দেশিকা তৈরির পর ওয়ার্ডভিত্তিক ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান নিবন্ধনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালে প্রথম দফায় আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আবেদনসহ ১-৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য ১০ লাখ টাকা এবং ৩৭-৫৪ নম্বর নতুন ওয়ার্ডের জন্য ৬ লাখ টাকা করে জামানত নেয় সিটি করপোরেশন।

আওয়ামী লীগের তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও তাঁদের স্বজনদের সুবিধা দিতে গিয়ে ওই পদক্ষেপ সফল হয়নি। পরে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোর জামানতের টাকা ফেরত দিয়ে দেয় করপোরেশন।

দ্বিতীয় দফায় ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আবার ভ্যান সার্ভিস নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এবারও আগ্রহীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়নি। সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, গুলশান, বনানী ও উত্তরার মতো এলাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা ময়লার কাজ নিতে আবেদন করেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে গত বছরের মার্চে প্রক্রিয়াটি বাতিল করে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্রতিবছর গৃহকর খাতে যে টাকা নেয়, তার ২ শতাংশ নেওয়া হয় পরিচ্ছন্নতা বাবদ।

একধরনের নৈরাজ্য চলছে

নগর-পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একধরনের নৈরাজ্য চলছে। ময়লা সংগ্রহের খাতটি লাভজনক হওয়ায় এটি রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ফলে এ কাজ সরাসরি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে না থেকে বিভিন্ন প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এতে একদিকে করপোরেশন রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকদের অন্যায্য বিল দিতে হচ্ছে।

সিটি করপোরেশন নিজেই কর্মী নিয়োগ দিয়ে বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহের কাজ করতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন কাজটি ঠিকভাবে করতে পারলে ময়লার বিল বেশি দেওয়া নিয়ে নগরবাসীকে হয়রানির শিকার হতে হবে না।

* (আগামীকাল পড়ুন—ঢাকা দক্ষিণ সিটি: ক্ষমতার ‘আশীর্বাদে’ চলে ময়লা-বাণিজ্য)