সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত ৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩৭ জন কোটিপতি পরিবারের। এর মধ্যে এক থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদ রয়েছে ১৭ জনের পরিবারের, আর পাঁচ কোটির ওপরে সম্পদ রয়েছে ২০ জনের পরিবারের। এই সংখ্যা মোট সংসদ সদস্যের ৭৪ শতাংশ। তাদের মধ্যে বিএনপির আছেন ২৭ জন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের ১০ জন।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য প্রকাশ
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন’—সংক্রান্ত এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) সংসদ সদস্যদের জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী সম্পদের এই বিবরণী সাজিয়েছে সুজন। সেখানে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নির্ভরশীলদের তথ্যও যুক্ত করা হয়েছে।
সম্পদের বিবরণ
সংসদ সদস্যদের মধ্যে ২০ জনের পরিবারের পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ জন বিএনপির, ১ জন জামায়াত জোটের। পরিবারের সম্পদ এক থেকে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত দেখিয়েছেন ১৭ জন। এর মধ্যে বিএনপির ৮ জন, জামায়াত জোটের ৯ জন। পাঁচ লাখের নিচে সম্পদ রয়েছে দুজনের, তাদের একজন বিএনপির, আরেক জন জামায়াত জোটের। এ ছাড়া বিএনপির একজন সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেননি।
আয়ের তথ্য
সংসদ সদস্যের মধ্যে যাদের পরিবারের আয় সবচেয়ে বেশি, তাদের ১০ জনই বিএনপির। এর মধ্যে বছরে কোটি টাকার বেশি আয় করে চার জনের পরিবার। তারা হলেন শামীম আরা বেগম, জহরত আদিব চৌধুরী, সাকিলা ফারজানা ও আন্না মিনজ। এ ক্ষেত্রেও সংসদ সদস্যদের আয়ের তথ্যের পাশাপাশি নির্ভরশীলদের তথ্য যুক্ত করেছে সুজন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুজন সংসদ সদস্যের পরিবার বছরে ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা আয় করে। তারা দুজনই বিএনপির। বছরে দুই লাখ টাকার কম আয় দুজনের পরিবারের, তারা জামায়াত জোটের। এ ছাড়া হলফনামায় আয়ের ঘর পূরণ করেননি সাত জন।
ঋণ ও দায়দেনা
সংসদ সদস্যদের মধ্যে ১০ জনের পরিবারের ঋণ ও দায়দেনা রয়েছে। তাদের মধ্যে কোটি টাকার বেশি ঋণ ও দায়দেনা রয়েছে চার জনের পরিবারের। তাদের সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। আর জামায়াত জোট থেকে নির্বাচিতদের মধ্যে দুজনের পরিবারের ঋণ ও দায়দেনা রয়েছে। যেসব সংসদ সদস্যের পরিবারের কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে, তারা হলেন সেলিমা রহমান, হেলেন জেরিন খান, শিরীন সুলতানা ও নিপুণ রায় চৌধুরী। তারা সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত।
আয়কর ও শিক্ষা
সুজনের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৪০ জনের আয়কর দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ১০ জন হলফনামায় আয়কর বিবরণী জমা দেননি। নারী সংসদ সদস্যের মধ্যে ৭৮ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত (স্নাতক ও স্নাতকোত্তর)। এর মধ্যে ৩০ জন স্নাতকোত্তর এবং ১৪ জন স্নাতক। ৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে আইনজীবী ১৩ জন আর ১০ জনের পেশা ব্যবসা।
মামলা
সংসদ সদস্যদের মধ্যে ছয় জনের বিরুদ্ধে বর্তমানে মামলা আছে। তারা সবাই বিএনপি থেকে নির্বাচিত। এছাড়া অতীতে মামলা ছিল ২১ জনের বিরুদ্ধে। অতীত ও বর্তমান উভয় সময়ে মামলা ছিল বা রয়েছে এমন সংসদ সদস্যের সংখ্যা চার জন। ৩০২ ধারায় বর্তমানে মামলা রয়েছে এক জনের বিরুদ্ধে এবং অতীতেও মামলা ছিল এক জনের বিরুদ্ধে।
সুজনের সুপারিশ
সুজনের সুপারিশ : নারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে কার্যকর ও অর্থবহ করার জন্য কতগুলো শর্ত পূরণ করা প্রয়োজন বলে মনে করে সুজন। শর্তগুলো হলো সংরক্ষিত নারী আসনের পদ্ধতিটিকে দলীয় নেতৃবৃন্দের অনুগ্রহনির্ভর ‘টোকেনিজমে’ পরিণত না করে সংসদে পর্যাপ্তসংখ্যক নারী প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি করা; সংরক্ষিত আসনেও সাধারণ আসনের মতো প্রত্যক্ষ ভোটের নির্বাচনের বিধান করা; জনগণের কাছে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের দায়বদ্ধতার বিধান তৈরি; এই আসন সংরক্ষণ পদ্ধতি এমন করা, যাতে কোনো দ্বৈততা (ওভারল্যাপিং) না থাকে, এ ক্ষেত্রে ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে সরাসরি আসনভিত্তিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে; সাধারণ আসনের মতো সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব হবে সমান; সংরক্ষিত আসনে মনোনয়নের ভিত্তি হবে নারী রাজনীতিবিদের যোগ্যতা; সংরক্ষিত আসনের পদটিকে দলীয় নেতৃবৃন্দ, বিশেষত দলীয় প্রধানের পৃষ্ঠপোষকতা বা অনুগ্রহ বণ্টনের হাতিয়ারে পরিণত না করা এবং নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ আসনের লক্ষ্য অর্জনের ন্যায়সঙ্গত ধারণা সামনে রেখে সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সাধারণ আসনে প্রতিটি রাজনৈতিক দল থেকে নির্দিষ্ট হারে প্রার্থী মনোনয়নের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা।



