ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী এলাকায় আকরাম গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ছয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও কারখানার মালিক এখনো অধরা। এর মধ্যেই প্রশাসনের সিলগালা করা কারখানাটিতে মালিকপক্ষের নির্দেশে ও পুলিশের সহায়তায় সীমানাদেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। গত শনিবার বিকেলে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের কদমতলী ডিপজল গলি সড়ক এলাকার কারখানাটিতে সীমানাদেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খবর পেয়ে পুলিশের আরেকটি দল ঘটনাস্থলে গেলে শ্রমিকেরা কাজ ফেলে পালিয়ে যান।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা
গত ৪ এপ্রিল ওই কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ছয় শ্রমিক দগ্ধ হয়ে মারা যান এবং আরও কয়েকজন আহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনের লাশ এখনো শনাক্ত করা যায়নি। শনাক্ত হওয়া তিনজন হলেন পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কবীরকাঠি গ্রামের জসিম উদ্দিন দুয়ারির স্ত্রী মঞ্জু বেগম (৩১), মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার আলীনগর গ্রামের বাসিন্দা রাজু মিয়ার স্ত্রী শাহীনুর বেগম (৩৫) ও বরিশালের মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা লাল চাঁনের স্ত্রী মীম আক্তার (১৬)।
মামলা ও তদন্ত
এ ঘটনায় পরদিন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা, শ্রম আইন এবং বিস্ফোরক আইনে মামলা করে। মামলায় কারখানার মালিক মো. আকরাম উল্লাহ আকরাম (৬৩), তাঁর ছেলে আহনাফ আকিফ আকরাম (৩৮), কেরানীগঞ্জ সিটি ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি ও বিএনপি নেতা ইমানউল্লাহ মাস্তানসহ (৫২) অজ্ঞাতনামা পাঁচ থেকে সাতজনকে আসামি করা হয়। মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ইমানউল্লাহ বর্তমানে কারাগারে, বাকি আসামিরা পলাতক।
গতকাল রোববার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, কারখানার পূর্ব পাশে প্রায় আট ফুট উঁচু সীমানাদেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। দেয়ালের পাশে অবশিষ্ট নির্মাণসামগ্রী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। নির্মাণকাজে যুক্ত রাজমিস্ত্রি শহিদুল ইসলাম বলেন, 'কারখানার মালিক আকরাম সাহেবের স্ত্রী ও মালিকপক্ষের নির্দেশে আমরা দেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু করি। থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রফিকুল সাহেবও আমাদের কাজ করার অনুমতি দিয়েছিলেন। আমাদের বলা হয়েছিল, কাজ করার অনুমতি আছে। পরে পুলিশ নিজে এসে বন্ধ করা কারখানার গেটের তালা ভেঙে আমাদের কাজ শুরু করার কথা বলেছেন। এতে আমাদের কোনো দোষ নেই।'
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামলার সাবেক তদন্তকারী কর্মকর্তা ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই রফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ বন্ধ পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
আগানগর ডিপজল গলি সড়ক এলাকার বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, 'যে কারখানায় এত মানুষ মারা গেল, সেটি বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু সেখানে আবার দেয়াল নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে। এটা আমাদের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। মালিকপক্ষের এত সাহস হয় কীভাবে? তাদের খুঁটির জোর কোথায়? পুলিশ কেন তাদের সহযোগিতা করবে? প্রশাসনের দুর্বলতা থাকায় তারা এত সাহস দেখাতে পেরেছে।'
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার পার্শ্ববর্তী এক বাড়ির মালিক বলেন, 'এসআই রফিক পুলিশের একটি দল নিয়ে কারখানার ফটকের কাছে আসেন। তাঁর নির্দেশে কারাখানার তালা ভেঙে সীমানাদেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এটা দেখে আমরা হতবাক হয়েছি, কিন্তু ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। যেখানে প্রশাসন এ কাজে বাধা দিবে, সেখানে তারাই এ কাজে সহযোগিতা করেছে!'
শ্রমিকদের বক্তব্য
অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে ফেরা কারখানার এক শ্রমিক (৪২) বলেন, 'আমরা আগুনের ঘটনা নিজ চোখে দেখছি। এখনো ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। অন্য কোনো কাজ যোগ দিয়েও মনোযোগ দিতে পারি না। চোখের সামনে বারবার সেই দিনের ঘটনা ভেসে উঠে। আমরা দোষী মালিকপক্ষের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।'
আরেক নারী শ্রমিক (৩২) বলেন, 'ওই দিন আগুনের মধ্যে যেভাবে মানুষ পুড়তেছিল, ওইডা এখনো ভুলতে পারি না। যারা মারা গেছে, তাদের বিচার তো দূরের কথা আসামিগো এখনো পুলিশ ধরতে পারে নাই। ওরা এখনো বাইরেই ঘুইরা বেড়ায়। কর্মচারীদের ওপর এত অত্যাচার কইরা, পুড়াইয়া মাইরাও ওদের শান্তি হয় নাই। আমরা কারখানার মালিকের বিচার চাই।'
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন বলেন, প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী কারখানাটি বন্ধ আছে। সেখানে কোনো ধরনের নির্মাণকাজের অনুমতি নেই। খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। কে বা কারা এই কাজের চেষ্টা করেছে, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত। যাতে কেউ দেশত্যাগ করতে না পারে, সে বিষয়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।



