বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯টি ভবন নির্মাণের কাজ গত দুই বছরেও শুরু হয়নি। পৃথক এই ৯টি মাল্টিস্টোরেজ বিল্ডিং নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
ঠিকাদারদের অভিযোগ
ঠিকাদারদের অভিযোগ, বেবিচক থেকে কার্যাদেশ পাওয়ার পর তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। তাতে রাজি না হওয়ায় কাজগুলো তৎকালীন চেয়ারম্যানকে দিয়ে বন্ধ করে দেন। কাজগুলো পাওয়ার পর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিমধ্যে নির্মাণ সামগ্রীও কিনে ফেলেছে বলেও দাবি করেছেন কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, ব্যাংক লোনের মাধ্যমে কেনা এসব সামগ্রী নষ্টের উপক্রম, অন্যদিকে ব্যাংক লোনের সুদও বাড়ছে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী জেলহাজতে
বেবিচকের সাবেক ওই প্রধান প্রকৌশলী দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়ের করা মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেল হাজতে রয়েছেন।
প্রকল্পের বিবরণ
জানা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বহুতল ৯টি ভবন নির্মাণ কাজের টেন্ডার আহ্বানের পর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেবিচক থেকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। বেবিচক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকটের বিষয়টি সমাধানের জন্য এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কার্যাদেশের তথ্যমতে, প্রকল্পের নাম ‘কুর্মিটোলায় ১৪ তলা আবাসিক ভবনসহ অন্যান্য কাজের জন্য ভবন নির্মাণ’; যার ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ২৪ মে। রাজধানীর কাওলায় একই ধরনের আরেকটি ভবন নির্মাণে কার্যাদেশ মূল্য ধরা হয়েছিল ২১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, যার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ১০ জুলাই।
সিভিল এভিয়েশন অ্যাকাডেমিতে মসজিদ নির্মাণের পাশাপাশি অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজের ভবন নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্পের কার্যাদেশ মূল্য ধরা হয়েছিল ২২ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এর কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর। একইভাবে তৃতীয় টার্মিনালের দক্ষিণ পাশে সিভিল এভিয়েশনের স্টেক হোল্ডাদের জন্য ভবন নির্মাণ, ব্যয় ২৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। ক্যাব সদর দফতরের পূর্ব পাশে ৬ তলা ভবন নির্মাণ আন্ডারগ্রাউন্ডসহ অন্যান্য সব সুবিধার ভবন নির্মাণ, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়ার তারিখ ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর।
সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড স্টোর ইউনিটের (সেমসু) অফিস কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের আরেক প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ২০ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ১৯ নভেম্বর। বেবিচকের কর্মকর্তাদের জন্য তেজগাঁওয়ে আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য কার্যাদেশ মূল্য ধরা হয় ২০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এই কার্যাদেশটি দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট। একই এলাকায় আরেকটি ভবন নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছিল ২২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়ার তারিখ ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট। কুর্মিটোলা আমবাগানে মসজিদ নির্মাণসহ অন্যান্য কাজের ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের ৩ জুলাই এটির কার্যাদেশ দেওয়া হয়।
ঠিকাদারদের আইনি পদক্ষেপের হুমকি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাজ বন্ধের পরও ঠিকাদাররা নানাভাবে কাজ শুরুর চেষ্টা চালিয়ে যান। কিন্তু কোনও কিছুই শুরু করতে পারেননি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন। এরপর বেবিচকের প্রকৌশল দফতর পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা করে। তারা চেয়ারম্যানের কাছে মতামত দেয়। যার একটি কপি বাংলা ট্রিবিউনের হাতে এসেছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এএইচএমডি নুরউদ্দিন চৌধুরী এবং সিভিল ডিভিশনের দুই নির্বাহী প্রকৌশলী নাসিম আল ইসলাম ও আবু সায়েমের সই করা ওই সুপারিশপত্রে লেখা হয়, ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি যথাযথ নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয়েছে। কার্যাদেশ দেওয়ার পরও ঠিকাদাররা শুরু করতে না পারায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এমতাবস্থায় তারা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছেন। যেহেতু এই প্রকল্পে কোনও ধরনের অসততার তথ্য পাওয়া যায়নি, তাই ঠিকাদাররা আইনের আশ্রয় নিলে বেবিচকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমতাবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে ঠিকাদারদের কাজ অনুমতি দেওয়া যেতে পারে।
মতামতটি দেওয়া হয় গত বছরের ২০ আগস্ট। কিন্তু বছর পার হয়ে গেলেও পরিস্থিতি আগের অবস্থায়ই রয়েছে। এমন অবস্থায় ঠিকাদাররা আইনের আশ্রয়ে যাচ্ছেন।
ঠিকাদারদের বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার বলেছেন, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এত ধরনা দিয়েছি, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু কোনও কিছুতেই লাভ হয়নি। বরং আশ্বাসে মাস ও বছর কেটে যাচ্ছে। কোনও কিছুই হচ্ছে না। এ কারণে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া আমাদের পথও নেই।
জানতে চাইলে এমএকে কনস্ট্রাকশনের মালিক আবদুল কাদির বলেন, আমরা কার্যাদেশ পাওয়ার পর সব প্রক্রিয়া শুরু করি। এরই মধ্যে প্রধান প্রকৌশলী আমাদের সবাইকে ডেকে কাজ শুরুর বিষয়ে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে বলেন। এরপর নানা অজুহাতে আমাদের ঘোরাতে থাকেন। সবশেষ আমাদের জানানো হয়, ৯ থেকে ১০ কোটি টাকার আয়োজন করতে। তিনি বলেন, এ ঘটনার প্রতিবাদ করার এক সপ্তাহের মধ্যে লিখিতভাবে কাজ না শুরু করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর থেকে শুধু আমরা ঘুরতেই আছি।
বেবিচক কর্মকর্তাদের প্রতিক্রিয়া
প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে বেবিচকের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই উপকৃত হবেন বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, যখন এই প্রজেক্টগুলোর অনুমোদন হয়, তখন বেবিচকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে একটা উৎসাহ ছিল। বেবিচকের কর্মকর্তা মাসুদ খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভেবেছিলাম, আমরা যে জীর্ণ-শীর্ণ ভবনে থাকি, সেটার হয়তো অবসান হবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জানতে পারলাম প্রজেক্টের কাজ স্থগিত করা হয়েছে। প্রজেক্টটি যেহেতু আমাদের বাসস্থানের ব্যবস্থা, সেহেতু বর্তমান স্যারেরা এটি চালুর উদ্যোগ নিলে আমরা উপকৃত হতাম। সংস্থাটির আরও দুই কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন ও শরিফুল ইসলামও একইরকম মত দেন।
বেবিচকের সদস্যের মন্তব্য
অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে এই প্রকল্পগুলোর অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচকের সদস্য (অপারেশনস) এয়ার কমোডর মেহবুব খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রকল্পগুলো নতুন করে চালুর বিষয়ে আমরা ভাবছি। বিষয়টি দ্রুত সমাধান করা হবে।



