মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েই চলেছে, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ
মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েই চলেছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা যেন দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। র‍্যাব-পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও নিয়মিত অভিযানে হাজার হাজার অপরাধী গ্রেফতার হলেও উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমছে না। বরং বিভিন্ন কিশোর গ্যাং আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

ইমন হত্যাকাণ্ড ও গ্যাং দ্বন্দ্ব

সম্প্রতি দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে ইমন হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে মোহাম্মদপুরের কিশোর গ্যাং সমস্যা। বছরের পর বছর ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ মোহাম্মদপুরের জনজীবন। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং পুলিশের নির্লিপ্ততা অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোরদের অপরাধ থেকে ফেরাতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। অপরদিকে পুলিশ জানিয়েছে, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাং সদস্যদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিভাবকদের আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নতুন গ্যাং

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব ও আনুগত্যে পরিবর্তন আসে। কেউ দল বদল করেছে। কেউ নতুন নেতৃত্বে যুক্ত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার সুযোগে গড়ে ওঠে এসব নতুন নতুন গ্যাং। ফলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বেগ পেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। গ্যাংগুলোর নিজেদের সংঘর্ষ, শক্তি প্রদর্শন এবং প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের সিসিটিভি ফুটেজ জনমনে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। গত এক বছরে কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় অন্তত তিনজন নিহত ও ১৫ জনের বেশি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সন্ধ্যার পর বদলে যায় মোহাম্মদপুর

মোহাম্মদপুরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সব জায়গাতেই সক্রিয় ছিনতাইকারীরা। বিশেষ করে রিকশাযাত্রী, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ তাদের প্রধান টার্গেট। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছুটির সময় মোবাইল ফোন, ব্যাগ ও ল্যাপটপ ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে অনেক রাইড শেয়ারিং চালকও এ এলাকায় যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।

ভুক্তভোগীরা জানান, সন্ধ্যা নামলেই মোহাম্মদপুরের চিত্র পাল্টে যায়। তিন রাস্তার মোড়, রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এলাকা, চাঁদ উদ্যান, লাউতলা, নবীনগর হাউজিং, বসিলা চল্লিশ ফিট, কাঁটাসুর, তুরাগ হাউজিং, আক্কাস নগর, ঢাকা উদ্যান নদীর পাড়, চন্দ্রিমা হাউজিং, আদাবর, শেখেরটেক ও মনসুরাবাদ- প্রায় সব এলাকাতেই একই চিত্র দেখা যায়। সন্ধ্যার পর বাইরে বের হওয়া অনেকের কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উঠতি বয়সী কিশোরদের কয়েকটি গ্রুপ প্রকাশ্যেই দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে জড়াচ্ছে। দিনদুপুরেও পথরোধ করে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে।

গ্যাং দ্বন্দ্ব ও ইমন হত্যাকাণ্ড

পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অ্যালেক্স ইমন গ্রুপের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও মাদক কারবারের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। ছিনতাইয়ে বাধা পেলে কুপিয়ে জখম করতেও দ্বিধা করেনা তারা। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গ্যাংগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ প্রায় নিয়মিত ঘটনা। ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দুই গ্যাংয়ের সংঘর্ষে দুজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। ইমন একটি বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করার পর এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বলে জানা গেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা জানান, ইমন হত্যার ঘটনায় তার মা মোছা. ফেরদৌসী বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত এজাহারভুক্ত আসামি সুমনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরমান শাহরুখ গ্রুপের সদস্যদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ইমনের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৮টি মামলা রয়েছে।

গ্রেফতার বাড়লেও অপরাধ কমছে না

পুলিশ জানিয়েছে, গত এক বছরে বিভিন্ন অপরাধে মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত তিন হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে অনেকেই জামিনে বের হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকায় একাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এর মধ্যে ‘কবজি কাটা গ্রুপ’ সবচেয়ে আলোচিত ছিল। ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। গ্রুপ প্রধান আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের তৎপরতা কিছুটা কমে। তবে অ্যালেক্স ইমন গ্রুপ বেশি সক্রিয় ছিল। এছাড়া পাটালি গ্রুপ, বেলচা মনির, টুন্ডা বাবু, লও ঠেলা, কালা রাসেল, ল্যাংড়া হাসান ও ‘চেতাইলেই ভেজাল’ নামে পরিচিত আরও কয়েকটি গ্যাংয়ের অস্তিত্বের কথা জানিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। তার মতে, অপরাধের ভয়াবহতা প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধের মতো হলেও কিশোরদের ক্ষেত্রে সংশোধনমূলক ব্যবস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা কিশোর অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।

যা বলছে পুলিশ

ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান জানান, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয়দের সঙ্গে বৈঠক করে সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে এবং অভিভাবকদের সন্তানদের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী বৃহস্পতিবার বসিলা এলাকায় ‘ওপেন হাউজ ডে’ আয়োজন করা হয়েছে। এতে ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার উপস্থিত থাকবেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশগ্রহণে কিশোর গ্যাং অপরাধ প্রতিরোধে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।