জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, তিনি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার পথে চলতে চান এবং ইনসাফভিত্তিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
শুক্রবার দুপুরে নেত্রকোনার কলমাকান্দা আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার সুবর্ণজয়ন্তী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, 'আমি আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলতে পারি, নির্বাচিত হওয়ার পর রাষ্ট্রীয় যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি, তার একটি টাকাও আমার জানা মতে অপব্যবহার হয়নি। আমি যত দিন আপনাদের এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করব, তত দিন দুর্নীতি আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।'
শিক্ষার্থীদের প্রতি উপদেশ
অনুষ্ঠানে কায়সার কামাল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, জীবনে সফল হতে হলে সততা, অধ্যবসায় ও সঠিক আদর্শ অনুসরণ করতে হবে। তিনি বলেন, 'আজ তোমাদের সামনে অনেক অনুপ্রেরণার মানুষ রয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানেরই একজন সাবেক শিক্ষার্থী বর্তমানে কাস্টমস বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তিনি একদিন এই মাদ্রাসার বেঞ্চে বসে পড়াশোনা করেছেন। আজ তিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। এ রকম আরও অনেক সফল মানুষ রয়েছেন, যারা এই অঞ্চল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গর্ব। তাদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে তোমাদের এগিয়ে যেতে হবে।'
রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রাম
নিজের রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের কথা তুলে ধরে ডেপুটি স্পিকার বলেন, 'আমরা যখন ছাত্রজীবনে পড়াশোনা করেছি, তখন সামনে অনুসরণ করার মতো তেমন কোনো বাতিঘর ছিল না। কিন্তু আজকের শিক্ষার্থীদের সামনে অনেক উদাহরণ রয়েছে। তারা চাইলে নিজেদের এলাকার সফল মানুষদের জীবন থেকে শিক্ষা নিতে পারে।' তিনি আরও বলেন, 'রাজনীতির পথ সব সময় সহজ ছিল না। ২০০৮ সালে নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি। ২০১৪ সালে নির্বাচন করেননি। ২০১৮ সালে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাননি। ২০২৪ সালেও নির্বাচন করেননি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, ধৈর্য ও সংগ্রামের পর ২০২৬ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন।'
তিনি বলেন, 'অনেকেই প্রশ্ন করেন, এত বছর অপেক্ষা করেও কীভাবে ধৈর্য ধরে ছিলাম। আমি তাদের বলি, সবুরে মেওয়া ফলে। মহান আল্লাহ জানেন মানুষের অন্তর। তিনি জানেন কে কোন উদ্দেশ্যে কাজ করে। সেই কারণে হয়তো ধৈর্য, সততা ও ন্যায়পরায়ণতার পুরস্কার এক সঙ্গে দিয়েছেন।'
দ্রুত দায়িত্বপ্রাপ্তি
নির্বাচিত হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়া প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, '১২ ফেব্রুয়ারি আমি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। ১২ মার্চ ডেপুটি স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছি। এর মধ্যেই প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছি। অনেকেই বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে খুব কম মানুষই এক মাসের মধ্যে তিনটি শপথ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। এটি আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি আল্লাহর রহমত এবং আপনাদের ভালোবাসার ফল।'
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ডেপুটি স্পিকার বলেন, 'আমি আপনাদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, সর্বোচ্চ চেষ্টা করব কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরকে একটি উন্নত, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে। এখানে হিংসা-বিদ্বেষ, প্রতিশোধ বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রাজনীতি থাকবে না। আমরা ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সমাজ গড়ে তুলতে চাই।'
অর্থনীতি ও সুশাসন
দেশের অর্থনীতি ও সুশাসনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, 'আমাদের কৃষক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ যারা লুটপাট করেছে, বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিচার হওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যেন কেউ জনগণের সম্পদ লুটে বিদেশে পাচার করার সাহস না পায়, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে জনগণের সম্পদ জনগণের কল্যাণেই ব্যবহৃত হবে।'
অনুষ্ঠানের অন্যান্য বক্তা
মাদ্রাসার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। মাদ্রাসার অধ্যাপক মো. আবুল হাসেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নাজমুন নাহার নীলু, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অতিরিক্ত কমিশনার মো. মিজানুর রহমান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম মিকাইল ইসলাম, এন আকন্দ কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. আব্দুল বাতেন এবং উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারী চান মিয়া। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এনামুল হক তালুকদার ও মোস্তফা কামাল।



