বিআইডব্লিউটিসিতে 'রাব্বি-রাজা' সিন্ডিকেটের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিআইডব্লিউটিসিতে রাব্বি-রাজা সিন্ডিকেটের দুর্নীতি

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চিফ পার্সোনাল ম্যানেজার (সিপিএম) মো. ফজলে রাব্বি ও ডেপুটি চিফ পার্সোনাল ম্যানেজার (ডিসিপিএম) রাজা মিয়ার দৌরাত্ম্যে সংস্থাটির চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সকল কর্মী তটস্থ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, তারা নানা কৌশলে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে বিধিবিধান লঙ্ঘন করেছেন। বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

দুই কর্মকর্তার আধিপত্য

ফজলে রাব্বি ও রাজা মিয়া নির্ধারিত সময়ের দুই বছর আগেই অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ইচ্ছেমতো বদলি করে রেখেছেন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তারা ভোল পালটে বিএনপির অনুগত হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন। যুগান্তরের অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ফজলে রাব্বি দীর্ঘদিন ধরে সিপিএম পদের চেয়ার দখলের পরিকল্পনা করছিলেন। পাবনায় তার বাড়ি হওয়ায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর পরিচয়ে তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে প্রভাব বিস্তার করেন।

অগ্রিম বদলি ও ঘুষ লেনদেন

বিআইডব্লিউটিসির জাহাজী কর্মকর্তাদের বদলি নীতিমালা উপেক্ষা করে ফজলে রাব্বি ও রাজা মিয়া আগাম অফিস আদেশ জারি করেছেন। ২০২৪ সালের স্বাক্ষরিত আদেশে ২০২৬-২০২৭ সালের জন্য ২০ জনকে পদায়ন করা হয়। প্রতিটি সুবিধাজনক বদলির জন্য ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যারা এই সিন্ডিকেটের বিরোধিতা করেছেন, তাদের শাস্তিমূলক বদলি দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অনিয়ম

২০২২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ৮৫ জন গ্রিজার নিয়োগের সার্কুলার দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের সময় ফজলে রাব্বি তড়িঘড়ি করে নিয়োগপত্র বিলি করেন। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারি নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন করা হয়। বাছাই কমিটির আহ্বায়ক হওয়ার কথা ছিল পরিচালক (প্রশাসন)-এর, কিন্তু ফজলে রাব্বি কৌশলে পরিচালক (কারিগরি) ওয়াসিফ আহমেদকে দায়িত্ব দেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পদোন্নতিতেও একই অনিয়ম দেখা গেছে। জ্যেষ্ঠতা তালিকা উপেক্ষা করে কম জ্যেষ্ঠ বা অযোগ্য ব্যক্তিদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর ও ২০২৫ সালের ৩ মার্চ জারিকৃত দুই আদেশে ৫৬ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়, যেখানে জ্যেষ্ঠতার চরম লঙ্ঘন ঘটে। এছাড়া ২০২৫ সালের ১২ মার্চ ২০ জন হুইল সুকানিকে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

চলতি দায়িত্ব প্রদানে অনিয়ম

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি লঙ্ঘন করে ফজলে রাব্বি নির্বিচারে চলতি দায়িত্ব দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট ফিডার পদ পূর্ণ না হয়েই তিনি প্রশাসনিক অনুমোদনের ভিত্তিতে চলতি দায়িত্ব প্রদান করেন। উদাহরণস্বরূপ, সৈয়দ আলীমুজ্জামানকে প্রথমে ‘কনিষ্ঠ নৌ কর্মকর্তা’ থেকে ‘নৌ অফিসার’-এর চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং এক মাসের মধ্যে তাকে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ নৌ বিভাগে বদলি করা হয়।

এছাড়া, ফজলে রাব্বি নিজের পদোন্নতিও বিধি লঙ্ঘন করে নিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটিতে ‘জিএম প্রশাসন’ পদে পদোন্নতি দেওয়ার কোনো বিধি না থাকলেও তিনি জেসমিন আরা বেগমকে চলতি দায়িত্ব থেকে জিএম পদে পদোন্নতি দেন।

অভিযোগ অস্বীকার

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ফজলে রাব্বি যুগান্তরকে বলেন, এসব অভিযোগ সঠিক নয় এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, অগ্রিম বদলি প্রকৌশল বিভাগের সুপারিশে হয়েছে। তবে প্রকৌশল বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানের সব শাখা থেকে সিপিএমকে লোকবলের চাহিদাপত্র দেওয়া হয়, কিন্তু ২০২৫ সালে স্বাক্ষর করে ২০২৬-২০২৭ সালের বদলি করা নীতি ও বিধিবিধানপরিপন্থি।

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর চিফ পার্চেজ অফিসার মানসুরা আহমেদকে সিপিএম পদে বদলি করা হলে ফজলে রাব্বি তা ঠেকাতে ২৬ অক্টোবর বহিরাগতদের নিয়ে তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহকে জিম্মি করেন। তিনি বিএনপির নামে গঠিত ট্রেড ইউনিয়নের স্বঘোষিত নেতাদের ব্যবহার করে বদলির আদেশ বাতিল করান। এরপর থেকে তার দাপট আরও বেড়ে যায়।

এসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ইতিমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি দুদকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়, কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।