গুম থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: সালাহউদ্দিন আহমদের অভিযাত্রা
২০১৫ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উত্তাল সময় কাটছিল। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া গৃহবন্দি অবস্থায় ছিলেন, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং রুহুল কবির রিজভীকেও অফিস থেকে আটক করা হয়। সেই সময় দলের অন্যান্য সিনিয়র নেতারা হয় কারাগারে ছিলেন, নয়তো আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। এমন এক পরিস্থিতিতে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদ দলের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
আত্মগোপনে থেকে বিবৃতি ও হাসিনার লক্ষ্য
যখন দলের পক্ষে কাজ করার মতো কেউ ছিল না, তখন সালাহউদ্দিন আহমদের বিবৃতিই ছিল একমাত্র আশ্রয়। যদিও তিনিও আত্মগোপনে ছিলেন, তবুও গোপন স্থান থেকে পাঠানো তার বিবৃতিগুলো ছিল অত্যন্ত বিস্ফোরক এবং প্রত্যক্ষ। তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তার বিবৃতির প্রভাবে এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি হয় যে, শেখ হাসিনা তাকে জঙ্গী হিসেবে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করেননি। নিরাপত্তা সূত্রে জানা যায়, হাসিনা নিজেই সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
গুম হওয়া ও ভারতীয় মাটিতে উদ্ধার
২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ নিখোঁজ হন। প্রায় ৬২ দিন পর একই বছরের ১১ মে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে স্থানীয় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। ভারতীয় পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, শিলংয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করার সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের ফোন পেয়ে সালাহউদ্দিনকে আটক করা হয়।
একটি বেসরকারি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে গুমের বর্ণনা দিতে গিয়ে সালাহউদ্দিন বলেছিলেন, "আমাকে যেদিন চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আমি জানতাম না যে আমাকে সীমান্ত পার করানো হচ্ছে। ভেবেছিলাম, আমাকে হয়তো ক্রসফায়ারের উদ্দেশ্যে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিলংয়ে তার চোখ খুলে দেওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে তাকে সম্ভবত ছেড়ে দেওয়া হবে। পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় তিনি পুলিশের শরণাপন্ন হন, কিন্তু পরে তাকে পাগলাগারদে পাঠানো হয়।
ভারতে মামলা ও আইনি লড়াই
সালাহউদ্দিন আহমদকে আটকের পর বৈধ নথিপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে মেঘালয় পুলিশ ফরেনার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী মামলা করে। ২০১৫ সালের ২২ জুলাই ভারতের নিম্ন আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে তার বিরুদ্ধে অনুপ্রবেশের অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতের রায়ে তিনি খালাস পান, কিন্তু ভারত সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে তাকে সেখানেই থাকতে হয়। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালতেও তিনি খালাস পান এবং আদালত তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
২০২৩ সালের ৮ মে সালাহউদ্দিন আহমদ ভ্রমণ অনুমোদনের জন্য আসাম রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন করেন। ভ্রমণ অনুমোদন পাওয়ার পর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট দিল্লি থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন এই সাবেক প্রতিমন্ত্রী।
রাজনীতিতে পুনরুত্থান ও বর্তমান অবস্থান
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সালাহউদ্দিন আহমদ আবারও হেভিওয়েট নেতা হিসেবে ঘুরে দাঁড়ান। বিএনপির মনোনয়নে তিনি কক্সবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
সালাহউদ্দিন আহমদের জন্ম ১৯৬২ সালে কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলার পেকুয়া ইউনিয়নের সিকদার পাড়া গ্রামে। তিনি পেকুয়ায় প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং ১৯৭৭ সালে পেকুয়ার শিলখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে রেকর্ড নম্বর পেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৭৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।
১৯৮৪ সালে এলএলবি এবং ১৯৮৬ সালে এলএলএম ডিগ্রি অর্জন করে তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এরই মধ্যে ১৯৮৫ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারে উত্তীর্ণ হন সালাহউদ্দিন। তিনি বগুড়ার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সহকারী একান্ত সচিব নিযুক্ত হন।
সালাহউদ্দিন আহমদের জীবনকাহিনী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়ের প্রতিফলন, যেখানে গুম, নির্বাসন এবং পুনরুত্থানের মাধ্যমে তিনি বর্তমানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।
