প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হলো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। এর আগে সর্বশেষ ২০০৬ সালে ক্ষমতায় থাকতে নির্বিঘ্নে এমন কর্মসূচি পালন করতে পেরেছিল দলটি। গত ১৭ বছরে বিরোধী দলে থাকায় দিবসটিতে নেতাকর্মীদের এক ধরনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাটতে হতো। তবে এবার ছেলের হাত ধরে রাষ্ট্রই পালন করলো বাবার ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। দেওয়া হয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। তাই এবার নেতাকর্মীসহ সর্বত্রই ছিল ভিন্ন রকম আবহ।
আট দিনের কর্মসূচি
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দলগতভাবে বিএনপির আট দিনের কর্মসূচি শুরু হয় গত ২৫ মে, যা চলবে ১ জুন পর্যন্ত। শনিবার (৩০ মে) সকাল থেকে রাজধানীর ১৫টি স্পটে বস্ত্র ও খাদ্য বিতরণ করা হয়। প্রতিটি কর্মসূচিতেই সশরীরে অংশগ্রহণ করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে সকালে নেতাকর্মীদের নিয়ে জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সেখান থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠ সংলগ্ন এলাকায় দুস্থ মানুষের মাঝে বস্ত্র বিতরণ কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একাধিক কর্মসূচিতে যান তিনি। প্রতিটি স্পটেই বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর সমাগম ঘটে। এছাড়া শীর্ষ নেতারাও এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন।
জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রী ও নেতাকর্মীদের ঢল
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী কর্মসূচির প্রথমে বেলা ১১টায় তার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বিএনপির পক্ষ থেকে শীর্ষ নেতাদের নিয়ে দ্বিতীয়বার শ্রদ্ধা জানান তিনি। এ সময় এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন ও ফাতেহা পাঠ করে সবাইকে নিয়ে দোয়া করেন তিনি। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়ে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শনিবার (৩০ মে) বেলা সোয়া ১১টায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম, শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের নিয়ে শেরে বাংলা নগরে সমাধিস্থলে যান দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে দলীয় প্রধান হিসেবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তারেক রহমান। তিনি চলে যাওয়ার পরপরই ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে সেখানে যান হাজার হাজার নেতাকর্মী। অনেকে নানা স্লোগান দেন। একে একে মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, কেন্দ্রীয় যুব দল, ছাত্র দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, কৃষক দল, মহিলা দল ও মুক্তিযোদ্ধা দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের পক্ষে আলাদা আলাদা ব্যানারে মিছিল আসতে থাকে। পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় জিয়ার সমাধিসহ জিয়া উদ্যানের আশপাশে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়।
১৬টি স্পটে খাবার ও বস্ত্র বিতরণ
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, নয়াপল্টন, ধানমন্ডি, শ্যামপুর, কুড়িলসহ ১৬টি স্থানে দুস্থদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিনব্যাপী প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। এ সময় জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন তিনি।
জিয়ার ‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতিতে এগোতে চান প্রধানমন্ত্রী
জিয়াউর রহমানের ‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতিতে চলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে দিনভর এ কর্মসূচিতে সশরীরে অংশগ্রহণ করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রাজনীতি ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানো, মানুষকে সহযোগিতা করা এবং দেশ গঠন করা। শহীদ জিয়ার সেই আদর্শে দীক্ষিত হয়ে দেশ গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করার শপথ নিতে হবে।’
মির্জা ফখরুল বললেন, ‘জিয়ার রাষ্ট্রচিন্তা অনুযায়ী চলবে সংস্কার’
বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দেশের চলমান সংস্কার কার্যক্রমও অনেক ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও তার দেখানো পথ ও আদর্শ অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সুশাসনভিত্তিক কাঠামোর দিকে যেতে চায় তার দল।’ শনিবার (৩০ মে) রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে তার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। মির্জা ফখরুল বলেন, ‘দেশকে এগিয়ে নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বিকল্প নেই।’
ভিন্নরকম আবহ
সর্বশেষ ২০০৬ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রীয়ভাবে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হয়। মাঝে দীর্ঘ ১৭ বছর তারা ছিল বিরোধী দলে। তখন বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তাদেরকে সেখানে যেতে হতো। আবার গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাধা না থাকলেও তখন দলীয় প্রধান যেতে পারেননি। তবে এবারের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার ও দলীয় প্রধান হিসেবে তারেক রহমানের আগমন ঘিরে সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের ঢল নামে জিয়া উদ্যানে। অনেকে স্লোগান নিয়ে সেখানে যান। বিজয় স্মরণীয় থেকে সমাধি পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ব্যানার-পোস্টার ও ফেস্টুনে ছেয়ে যায়। ঢাকার ১৬টি স্পট ও জেলা-উপজেলা পর্যায়েও ছিল একই চিত্র। বিএনপির ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্য সচিব তানভীর আহমদ রবিন বলেন, ‘যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন জিয়াউর রহমানের নাম থাকবে মানুষের মণিকোঠায় লিপিবদ্ধ থাকবে। তাই শাহাদাতবার্ষিকীতে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছেন।’ তিনি মনে করেন, অতীতে নানা বাধা বিঘ্ন ছিল। কিন্তু এবার সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে হওয়ায় নেতাকর্মীদের সমাগম বেশি হয়েছে।



