তোষামোদের রাজনীতি ও অর্থনীতি: স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিস্ফোরণের পথ
তোষামোদের রাজনীতি ও অর্থনীতি: স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিস্ফোরণ

তোষামোদের রাজনীতি ও অর্থনীতি: স্বেচ্ছাচারিতা থেকে বিস্ফোরণের পথ

পৃথিবীজুড়ে তোষামোদের একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস বিদ্যমান। প্রাচীনকালে রাজসভাগুলো ছিল চাটুকারিতার প্রধান আখড়া, যেখানে রাজারা সভাসদ, মোসাহেব ও তোষামোদকারীদের পরিবেষ্টিত হয়ে থাকতে পছন্দ করতেন। এসব ব্যক্তির মূল কাজ ছিল রাজার গুণগান করা, তাঁর মহত্ত্বের বারবার ঘোষণা এবং শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার। এ প্রক্রিয়ায় রাজা একধরনের আত্মপ্রসাদ লাভ করতেন, যা পরবর্তীতে আত্মম্ভরিতায় রূপ নিত। তবে তোষামোদ কেবল রাজপরিবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না; জমিদার, ধনকুবের ও ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের মাঝেও এটি ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। প্রকৃতির নিয়ম হলো, অর্থ, সম্পত্তি, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই চাটুকার ও মোসাহেবরা এসে জমে যায়।

সাধারণ জীবন ও রাজনীতিতে তোষামোদের বিস্তার

রাজরাজড়াদের জগতের বাইরেও সাধারণ জীবনপ্রবাহে তোষামোদ বিরাজ করে। দপ্তরপ্রধানের সঙ্গে অধস্তন কর্মচারীদের, প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা-আকাঙ্ক্ষীদের, সম্পদশালীদের সঙ্গে সম্পদহীনদের তোষামোদের কাহিনি সর্বজনবিদিত। তবে সামষ্টিক পর্যায়ে রাজনীতি ও অর্থনীতির অঙ্গনে তোষামোদের মাত্রিকতা, গভীরতা ও প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির ক্ষেত্রে দুটি পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রথমত, দেশের রাজনীতি মোটামুটিভাবে তোষামোদেরই রাজনীতি—যেখানে শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মধ্যস্থানীয় নেতাদের, বৃহৎ নেতার সঙ্গে ক্ষুদ্র নেতার কিংবা নেতার সঙ্গে কর্মীর সম্পর্কে চাটুকারিতা প্রকট। দ্বিতীয়ত, তোষামোদের রাজনীতির একটি গতিময়তা আছে; এটি স্থবির নয়, বরং তোষামোদকারী ও তোষিতের মধ্যকার সম্পর্কের প্রকৃতি সময়ের সঙ্গে বদলায়।

তোষামোদের রাজনীতির লক্ষ্য ও পরিণতি

তোষামোদের রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে আনুকূল্য লাভ—রাজনৈতিক সুবিধা, অর্থনৈতিক লাভ, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি অর্জন। নানান প্রকারের সুবিধা বাগানোই এ রাজনীতির একটি মুখ্য উদ্দেশ্য, যা তোষামোদকারীদের মধ্যে অদৃশ্য প্রতিযোগিতা ও প্রতিহিংসার আবহ সৃষ্টি করে। তবে এর সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো তোষিত নেতাকে স্বেচ্ছাচারী করে তোলা। মিথ্যা স্তবগান ও ফাঁকা প্রশংসার মাধ্যমে অনুগামীরা নেতাকে এ ধারণা দিতে চেষ্টা করে যে তিনিই সর্বজ্ঞানী ও চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী, যা বাংলাদেশের অতীত রাজনীতিতে বারবার প্রত্যক্ষ করা গেছে।

স্বেচ্ছাচারিতার এ প্রক্রিয়া ক্রমান্বয়ে নেতাকে বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়। তোষামুদেরা কখনো সত্য তুলে ধরে না, বরং অলীক উন্নতি ও অগ্রগতিই পেশ করে। এতে নেতার চোখে এমন ঠুলি এঁটে যায় যে তিনি শুধু তা-ই দেখতে পান, যা চাটুকারেরা দেখাতে চায়। রাজনীতিতে শত্রু চেনা সহজ হলেও মিত্র চেনা কঠিন, আর তোষামোদ এ প্রক্রিয়াকে আরও দুরূহ করে তোলে। তোষামোদকারীরা মিত্রের বেশ ধরে অবস্থান করে রাজনীতিকে অগণমুখী করে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য মারাত্মক হুমকি।

অর্থনীতিতে তোষামোদের প্রভাব

রাজনীতির পাশাপাশি তোষামোদের অর্থনীতির বলয়ও ব্যাপক ও সুসংহত। এখানে মূল কথা হলো চাটুকারিতার মাধ্যমে আর্থিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা হাতানো, যেখানে তোষামোদী ও তোষিত—উভয়েরই স্বার্থ জড়িত। তোষামোদের অর্থনীতির একটি বিশেষ মাত্রিকতা হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা, যেখানে তোষিত নেতা ও তার চাটুকারেরা অর্থনৈতিক বিধিবিধান ও শৃঙ্খলাকে উপেক্ষা করেন। বিগত দিনগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এ–জাতীয় প্রবণতা বারবার লক্ষ্য করা গেছে।

তোষিত নেতাকে একক ক্ষমতার অধিকারী করতে প্রায়ই সন্ত্রাস ও অস্ত্রের ব্যবহার প্রয়োজন হয়, যা তোষামোদের অর্থনীতির একটি পার্শ্বমাত্রিকতা। এজন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা নানা উৎস থেকে আসে। জনগণের অর্থের অপচয় এ অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক, যেখানে ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান, তোরণ ও উপঢৌকনের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে একটি শ্রেণির ক্রমাগত অর্থনৈতিক স্ফীতি ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষয়িষ্ণুতা ঘটতে থাকে, যা শ্রেণিবৈষম্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে তীব্র করে।

চূড়ান্ত পরিণতি: বিস্ফোরণ ও পতন

তোষামোদের রাজনীতি ও অর্থনীতির চূড়ান্ত কথা হলো, মোসাহেবদের কোনো স্থায়ী প্রভু, আনুগত্য বা অঙ্গীকার নেই; তাদের শুধু আছে স্থায়ী স্বার্থ। তাই প্রভু বা নেতা বদল এ ব্যবস্থার একটি গতিময় দিক, যেখানে চাটুকারেরাই নেতাদের পতনের পথ তৈরি করে এবং নতুন প্রভুর সন্ধানে বের হয়। কবি শামসুর রাহমানের ভাষায়, ‘প্রভুর জীবন রক্ষার করার তাগিদে অকাতরে প্রাণ দেয় ওরা, কিন্তু মানুষেরা হুজুরের শক্তি থাকে যতদিন ততোদিন তাঁবেদার... প্রভুর গর্দান গেলে, পেছনের দরজা দিয়ে পালায় কৌশলে লাশ ফেলে।’

স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ পুরো প্রক্রিয়ায় দুর্যোগ ও সংকটের জন্ম দেয়, যার ফলে সামাজিক মেরুকরণ দ্রুতগতিতে ঘটে। একসময় সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং পুরো কাঠামোর বিস্ফোরণ ঘটে। গণ–আন্দোলন থেকে শুরু করে তা একপর্যায়ে পুরো ব্যবস্থার ভাঙন সূচিত করে। তোষামোদের রাজনীতি ও অর্থনীতির ধারক-বাহকদের এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, তারা নিজেরাই তাদের মরণফাঁদ গড়ে তুলছে।