জামায়াতে ইসলামীর ঐতিহাসিক উত্থান: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৮ আসনে একক জয়
জামায়াতের ঐতিহাসিক উত্থান: ৬৮ আসনে একক জয়

জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক মোড়: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৬৮ আসনে একক বিজয়

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে জোট-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির অভাবনীয় প্রদর্শন করেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়া এই নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী দলটি এককভাবে ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত। জোটগত হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭টি আসনে, ফলে সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও দলটি এখন বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে।

অতীতের তুলনায় বর্তমানের ঐতিহাসিক অর্জন

জামায়াতে ইসলামীর এই একক বিজয় দলটির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে দলটি এককভাবে মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হতে পেরেছিল। বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১৯৯১ সালে ১৭টি, ২০০১ সালে ১৫টি এবং ২০০৮ সালে ২টি আসনে জয় পেয়েছিল জামায়াত। সেই তুলনায় এবারের ফলাফল দলটির জন্য একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ১৭ বছর পর জামায়াত নিজস্ব নেতৃত্বে জোট গঠন করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। সরকার গঠনের মতো আসন না পেলেও জোটগত ৭৭ আসন প্রাপ্তিকে জামায়াতের বড় উত্থান হিসেবে বিশ্লেষকেরা দেখছেন।

ঢাকায় অভূতপূর্ব সাফল্য

জামায়াতে ইসলামী অতীতে রাজধানী ঢাকায় একটি আসনও জয় করতে পারেনি। কিন্তু এবার ঢাকা মহানগরের ১৫টি আসনের মধ্যে ৬টিতে জয়লাভ করেছে—ঢাকা-৪, ৫, ১২, ১৪, ১৫ ও ১৬ নম্বর আসন। এ ছাড়া জোটের প্রার্থী ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জয়ী হয়েছেন ঢাকা-১১ আসনে। ঢাকার আরও পাঁচটি আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, যেখানে জামায়াত বা জোটের প্রার্থীরা কম ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা-১০ আসনে ৩ হাজার ৩০০ ভোটের ব্যবধানে এবং ঢাকা-৭ আসনে ৬ হাজার ১৮৩ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন। বিভিন্ন এলাকায় আরও অনেক আসনে হারলেও দলটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়েছে, যা তাদের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব

ফলাফলের ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চল—রংপুর ও রাজশাহী বিভাগ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল—খুলনা বিভাগ জামায়াতের সাফল্যের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে, রংপুরের ৩৩টির মধ্যে ১৬টি এবং রাজশাহীর ৩৯টির মধ্যে ১১টি আসনে জয় পেয়েছে দলটি। সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নীলফামারী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সব আসনে জয়লাভ দলটির আঞ্চলিক প্রভাবের গভীরতা প্রদর্শন করে। রংপুর ও কুড়িগ্রামের সব আসন জোটগতভাবে জয়ী হওয়াও তাৎপর্যপূর্ণ; এর মধ্যে দুটি আসন পেয়েছে শরিক দল এনসিপি। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। ঢাকার ৭০টির মধ্যে ৮টি এবং চট্টগ্রামের ৫৮টির মধ্যে ৩টি আসনে জামায়াত এককভাবে জয় পেয়েছে। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল জোটের শরিক খেলাফত মজলিস একটি আসন পেয়েছে।

তরুণ ও নারী ভোটারদের সমর্থন

এবারের নির্বাচনে তরুণ ও নারী ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকেছে—এমন আলোচনা ব্যাপকভাবে শোনা যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাফল্যকেও কেউ কেউ এর প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখছেন। গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের দল এনসিপির সঙ্গে নির্বাচনী ঐক্য বা জোটও একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষক নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এ কে এম ওয়ারেসুল করিমের পর্যবেক্ষণে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, জামায়াত রক্ষণশীল ডানপন্থী পরিচয় থেকে মধ্য-ডানপন্থী দল হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং অনেকাংশে সফল হয়েছে। এত দিন বিএনপিকে জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী ঘরানার ভোটগুলোর প্রধান জিম্মাদার মনে করা হতো, কিন্তু এবার জামায়াত সেই ভোটে ভাগ বসাতে পেরেছে। দলটি নিজেদের ‘ক্ষমতামুখী নয়, পরিবর্তনের পক্ষে’ শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যার প্রভাব তরুণদের মধ্যেও পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিপরীত মতামত ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

জামায়াতের এই উত্থান নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ বাসায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট শাসন চলার কারণে যখনই গণতন্ত্র চাপা পড়ে এবং মানুষের কণ্ঠ রোধ করা হয়, তখন উগ্রবাদী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে—সেটাই এ দেশে ঘটেছে। জামায়াতের যেটুকু উত্থান হয়েছে, তা আওয়ামী লীগের দমন-পীড়নমূলক শাসন, বিরোধী দলকে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না দেওয়া এবং নির্বাচন করতে না দেওয়ার কারণেই হয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। এই রাজনৈতিক বিতর্ক দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।