বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদ
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসে তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের তাগিদ

বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৬ শতাংশই তরুণ (১৫-২৯ বছর বয়সী), যার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৭০ লাখ। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, এই তরুণ জনসংখ্যার আকার ২০৩৬ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই তরুণেরাই সংখ্যার দিক থেকে বৃহত্তম, ডিজিটালি সবচেয়ে বেশি যুক্ত এবং সবচেয়ে শিক্ষিত প্রজন্ম। একই সঙ্গে তাঁরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যার মধ্যে তরুণীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছেন। দেশের প্রায় অর্ধেক মেয়েরই ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তাঁদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।

তরুণদের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

ইউএনএফপিএ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ডেমোগ্রাফিক ফিউচার সার্ভে’, যা এ বছর বাংলাদেশসহ ৭৩টি দেশের প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত হয়েছে, তাতে দেখা গেছে যে সব জায়গার তরুণেরাই মূলত একই জিনিস চান—আর্থিক নিরাপত্তা, স্থায়ী কর্মসংস্থান এবং পরিবার গড়ে তোলার সুযোগ। দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ-তরুণী ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ-তরুণী বিয়ে করতে চান। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৮ জন মনে করেন, সন্তান সংসারে যে আনন্দ নিয়ে আসে, সেটিই মা–বাবা হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অথচ ৮৮ শতাংশ তরুণ-তরুণী মনে করেন, আর্থিক নিরাপত্তা হলো মা–বাবা হওয়ার একটি পূর্বশর্ত; ৮৭ শতাংশ স্থায়ী কর্মসংস্থানের কথা উল্লেখ করেছেন এবং অর্ধেকের বেশি অর্থনৈতিক ও আবাসনসংকটকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তরুণদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তৈরি করাই এখন তাঁদের মূল দাবি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ

বাংলাদেশ এখন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের সুযোগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্ভরশীলতার অনুপাত—কর্মক্ষম বয়সের তুলনায় নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর (শিশু ও প্রবীণ) হার বর্তমানে ১ দশমিক ০৬৮। ২০৪২ সালের দিকে এটি সর্বোচ্চ প্রায় ১ দশমিক ১২৬–এ পৌঁছাবে, যা প্রায় দুই দশক ধরে দ্রুত প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করবে। এর প্রাপ্তি যেমন বিশাল, তেমনি এটি হাতছাড়া করার ঝুঁকিও ঠিক ততটাই বড়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

দেশের প্রায় অর্ধেক মেয়েরই ১৮ বছরের আগে বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তাঁদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাগুলো বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। কিশোরীদের তথ্য-উপাত্তের দিকে তাকালে এই জনমিতিক লভ্যাংশ বা সুফল হারানোর বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট এবং অন্যায্য বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, এখনো জাতীয়ভাবে বাল্যবিবাহের হার ৪৭ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি ১ হাজার জন নারীর মধ্যে কিশোরী মাতৃত্বের হার এখনো ৯২ জন। শৈশব ও কৈশোরে গর্ভধারণ মেয়েদের এবং তাদের সন্তানদের মৃত্যু ও অক্ষমতার বিশাল ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। বিশ্বব্যাপী নিম্ন–মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণীদের প্রতি ৪টি মৃত্যুর মধ্যে ১টি মাতৃত্বের কারণে ঘটে থাকে।

জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও প্রযুক্তির হুমকি

বাল্যবিবাহ এবং কম বয়সে গর্ভধারণই একমাত্র হুমকি নয়। নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪–এর তথ্য অনুযায়ী, কিশোরী মেয়ে ও তরুণীরা দেশের যেকোনো বয়সীদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সহিংসতা যে জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি হয়, তাদেরকে শিক্ষিত করা, কর্মসংস্থানে যুক্ত করা এবং ক্ষমতায়ন করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

সহিংসতা কেবল দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের সমান্তরাল কোনো সংকট নয়। এই সহিংসতাই মেয়েদের স্কুল থেকে ঝরে পড়া, বাল্যবিবাহ, কর্মক্ষেত্র থেকে পিছিয়ে পড়ার পেছনে প্রধান কারণ এবং সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে যা একদম নতুন এবং দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা হলো এই সহিংসতার ক্ষেত্র। ইন্টারনেট সংযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত প্রসারের পাশাপাশি প্রযুক্তি-সহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা একটি মারাত্মক এবং ক্রমবর্ধমান হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

অবৈতনিক কাজের ভারসাম্যহীনতা

বাংলাদেশের নারীরা প্রতিবছর ৫ দশমিক ১৯ ট্রিলিয়ন (লাখ কোটি) টাকা সমমূল্যের অবৈতনিক গৃহস্থালি ও সেবামূলক কাজ করেন, যা জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রায় ১৫ শতাংশ এবং জাতীয়ভাবে মোট অবৈতনিক কাজের ৮৪ শতাংশ। ‘ডেমোগ্রাফিক ফিউচার সার্ভে’ নিশ্চিত করে যে সেবামূলক কাজের এই দায়িত্বে সব জায়গাতেই জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য রয়ে গেছে। বাংলাদেশে এই প্রথাগত ভারসাম্যহীনতার জন্য একটি চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে; যার স্পষ্ট প্রমাণ, বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী প্রতি ৫ জন তরুণের মধ্যে ১ জন শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা কোনো ধরনের প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছেন এবং তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি।

নীতিগত অগ্রগতি ও বাস্তবায়নের প্রয়োজন

এসব প্রতিকূলতার বিপরীতেও আশাবাদী হওয়ার মতো বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের নতুন জাতীয় জনসংখ্যা নীতি এবং সরকারের ‘পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০)’—উভয় ক্ষেত্রেই জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনকে জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডার কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এই নীতিগত কাঠামোতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে নারী ও কন্যাশিশুদের পূর্ণ এবং সমান অংশগ্রহণ ছাড়া এই লভ্যাংশ অর্জন করা সম্ভব নয় এবং তাদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশ জনমিতিক লভ্যাংশের এই বিরল সুযোগের দুয়ার চিরকাল খোলা থাকবে না। ২০২৬ সালের তরুণ প্রজন্মকে যদি এখনই বিকশিত হওয়ার মতো অনুকূল পরিবেশ দেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতের বোঝা তাদেরই বইতে হবে। এর অর্থ হলো বাল্যবিবাহ বন্ধে দেশব্যাপী সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিশোর-কিশোরীরা যেন যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, তথ্য ও শিক্ষার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করতে ভিন্নধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার; যাতে তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। এর জন্য আরও প্রয়োজন আইনি জবাবদিহি এবং অনলাইন সহিংসতা মোকাবিলার জন্য নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সর্বোপরি, বর্তমানে (সুযোগ থেকে) বঞ্চিত লাখ লাখ তরুণের জন্য সেবামূলক কাজের পুনর্বণ্টন এবং মানসম্মত কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা প্রয়োজন।

ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ সরকার, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে জেন্ডার, ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিস্থিতি নির্বিশেষে প্রত্যেক তরুণ তাঁদের সুপ্ত সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অসংখ্য স্বপ্নে উজ্জীবিত এবং এই স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে। তারা কাজ করতে চায়, পরিবার গঠন করতে চায় এবং দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চায়। এ–সংক্রান্ত নীতিগত রূপরেখাগুলো বহুলাংশে তথ্যপ্রমাণভিত্তিক পদক্ষেপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এখন দেশব্যাপী এর ব্যাপক বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

ইউএনএফপিএ বাংলাদেশ সরকার, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে, যাতে জেন্ডার, ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিস্থিতি নির্বিশেষে প্রত্যেক তরুণ তাঁদের সুপ্ত সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পারেন। একটি দেশের অগ্রগতি কতজন শিশু জন্মগ্রহণ করল তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়; বরং প্রত্যেক তরুণ, প্রত্যেক কন্যাশিশু তাদের মনের মতো পরিবার এবং ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারছে কি না, তা দিয়ে বিচার করা উচিত। আকাঙ্ক্ষা ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে আছে; এখন আমাদের দায়িত্ব একে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

ক্যাথরিন ব্রিন কামকং: ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি, বাংলাদেশ