দেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার (টিএফআর) সামান্য বেড়েছে। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) যৌথ জরিপ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) বলছে, বর্তমানে টিএফআর ২.৪, অর্থাৎ একজন মা গড়ে ২.৪টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। আগে এই হার ছিল ২.৩।
প্রজনন হার বৃদ্ধির কারণ ও উদ্বেগ
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফী আহমদ বলেন, 'এটুকু বৃদ্ধিই উদ্বেগজনক। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা ও গভীর বিশ্লেষণ দরকার।' ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের শিক্ষকেরাও একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ), ইউনিসেফ এবং আইসিডিডিআরবির জনসংখ্যাবিষয়ক কর্মকর্তা ও গবেষকেরাও টিএফআর বৃদ্ধিকে ভালো লক্ষণ হিসেবে দেখছেন না।
জনসংখ্যার চাপ বাড়ার আশঙ্কা
দেশে প্রজননবয়সী মায়ের সংখ্যা সাড়ে চার কোটি। টিএফআর বৃদ্ধির অর্থ জনসংখ্যার চাপ আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রবণতা দুর্বল পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের আলামত। বর্তমানে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত ২৭ শতাংশ পদ খালি। নতুন নিয়োগ বন্ধ আছে এবং সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সংকট প্রবল।
জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সংকট
২০২৪ সালের শুরু থেকে মাঠপর্যায়ে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সরবরাহ ঠিকমতো হচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে ও অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী কিনতে গড়িমসি করা হয়েছে। বর্তমানে সারা দেশে সামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় পণ্যাগার থেকে আঞ্চলিক পণ্যাগারগুলোতে পর্যাপ্ত মজুত নেই। গত ২৪ মার্চ ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, কোনো আঞ্চলিক পণ্যাগারে মুখে খাওয়ার বড়ি, আইইউডি ও ইমপ্ল্যান্টের মজুত ছিল না।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা
বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন, বেশ কয়েক বছর ধরে জনসংখ্যার বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। ২০১০ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, 'বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আমি শক্তি মনে করি, বোঝা নয়।' এই বক্তব্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অনেকে। এছাড়া জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদের সভা বিগত ১৫ বছরে মাত্র একবার হয়েছে।
ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
বাংলাদেশ জাতীয় পরিবার পরিকল্পনা কৌশলপত্র (২০২৫-২০৩০) প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে সেবা ও সামগ্রী সহজলভ্য করা, সেবার মান বৃদ্ধি, বৈষম্য দূর করা, শহরে পরিবার পরিকল্পনা সেবা জোরদার করা এবং গবেষণা জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, 'জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে। টিএফআর কমানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করতে হবে। আমাদের যত কম সময়ে সম্ভব টিএফআর ২.১-এ নামাতে হবে।'



