হেফাজতে ইসলামের নেতাদের রাজনৈতিক বিভাজনে সংগঠনে 'ত্রিশঙ্কু' অবস্থা
হেফাজতে ইসলামে নেতাদের রাজনৈতিক বিভাজনে সংকট

হেফাজতে ইসলামের নেতাদের রাজনৈতিক বিভাজনে সংগঠনে 'ত্রিশঙ্কু' অবস্থা

কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক 'অরাজনৈতিক' সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০১৩ সালের শাপলা চত্বর সমাবেশ এবং নারী নীতি ও মোদিবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে সংগঠনটি তার অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। তবে সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক মেরুকরণ ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান সংগঠনটির ভেতরে এক ধরনের 'ত্রিশঙ্কু' পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

নির্বাচনি মাঠে নিজেরাই প্রতিপক্ষ

নির্বাচনের কয়েক মাস আগে থেকেই হেফাজতের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মতভেদ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংগঠনের আমির মাওলানা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে ফতোয়া দেন যে তাদের ভোট দেওয়া 'হারাম'। অথচ হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকসহ একঝাঁক শীর্ষ নেতা জামায়াতের সঙ্গে রাজনৈতিক গাঁটছড়া বেঁধে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। অপরদিকে, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতারা, যারা হেফাজতের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন, তারা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থেকে নির্বাচনে লড়েছেন। ফলে, হেফাজতের একই ব্যানারে থাকা নেতারা নির্বাচনি মাঠে একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হন, যা সংগঠনের অভ্যন্তরীণ ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল তৈরি করেছে।

রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে বিভক্ত নেতৃত্ব

হেফাজতের প্রায় সব শীর্ষ নেতাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে রয়েছেন, যারা প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে আলাদা জোটে আছেন। উদাহরণস্বরূপ, জমিয়তে উলামায়ে বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, যিনি হেফাজতে ইসলামের উপদেষ্টা, তিনি বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ নির্বাচন করেছেন। একইভাবে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, যিনি হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব, তিনি জামায়াতের প্ল্যাটফর্মে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। এই বিভাজন শুধু নির্বাচনি মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সংগঠনের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে বলে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থবিরতা নাকি স্বাভাবিক গতি?

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের এক শীর্ষ নেতা জানান, নির্বাচনের আগে থেকেই সংগঠনের ভেতরে আদর্শিক মতবিরোধ চলছে, এবং রাজনৈতিক স্বার্থে বড় দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় মূল অরাজনৈতিক কার্যক্রম কিছুটা 'ঢিমেতালে' চলছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে। তবে, এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন সংগঠনের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী। তিনি দাবি করেন, 'আমাদের লক্ষ্য ধর্মীয় স্বার্থ সংরক্ষণ। রাজনৈতিক কারণে নেতারা ভিন্ন মঞ্চে থাকলেও ইসলামের প্রশ্নে আমরা সবাই এক ব্যানারে আপসহীন।' হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীও একই সুরে বলেন, 'হেফাজত সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক। নেতারা তাদের রাজনৈতিক নীতি ও আদর্শ এখানে চাপিয়ে দেন না।'

হেফাজতের উত্থান ও প্রেক্ষাপট

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ মূলত ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রস্তাবিত 'জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি'র প্রতিবাদে গঠিত হয়। ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার তৎকালীন মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে আমির করে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা পায়। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের মাধ্যমে সংগঠনটি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করে এবং রাজনৈতিক উত্থান ঘটে। এরপর থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে হেফাজতে ইসলাম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে, যেমন ২০২১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরবিরোধী আন্দোলন। দীর্ঘ দেড় দশকের পথচলায় হেফাজত অরাজনৈতিক চরিত্রের দাবি করলেও দেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে এর প্রভাব অত্যন্ত স্পষ্ট।

বর্তমানে, শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক বিভাজন সংগঠনের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও ঐক্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, যা হেফাজতে ইসলামকে একটি ক্রসরোডে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে সংগঠনটি তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।