খুলনা নগরের প্রাণকেন্দ্র ডাকবাংলো মোড়। এলাকাটি দিনের বেশির ভাগ সময় সরগরম থাকে। সেই ব্যস্ত জায়গাতেই গত ৪ মার্চ রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহকে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। সবার চোখের সামনে দিয়ে চলে যায় খুনিরা। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে খুলনায় এভাবে প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও জখমের আলোচিত অর্ধশত ঘটনা ঘটেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত ২২ মাসে খুলনা শহর ও জেলায় এমন ঘটনা দুই শতাধিক।
হত্যার পেছনে অস্ত্র-মাদক ও চাঁদাবাজি
বেশির ভাগ খুনোখুনির পেছনে অস্ত্র ও মাদক কারবার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ ও পূর্বশত্রুতা রয়েছে বলে স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে। সর্বশেষ খুনের ঘটনা ঘটে ২ জুন নগরের লবণচরা থানা এলাকার সাচিবুনিয়া স্কুলভিটা এলাকায়। দুপুর ১২টার দিকে কাজী রাশিদুল ইসলাম নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ব্যক্তিগত বিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করা হলেও যাঁকে দায়ী করা হচ্ছে, তিনি আলোচিত একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য। যিনি আড়াই মাস আগে নিহত যুবকের পরিবারের সদস্যদের গুলি করেছিলেন বলে অভিযোগ আছে।
সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বেপরোয়া তৎপরতা
খুলনার অপরাধের বেশির ভাগ ঘটনায় ঘুরেফিরে আটটি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম এসেছে। এখন তারা এতটাই বেপরোয়া যে জনবহুল এলাকায়ও খুনোখুনি করতে দ্বিধা করছে না। মানুষও প্রতিরোধে এগিয়ে আসার বা সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস করে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা ও অদক্ষতার সুযোগেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়েছে।
পুলিশের পরিসংখ্যানে খুনের হার
গত পাঁচ বছরের পুলিশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় খুনের ঘটনা বেড়েছে। খুলনা মহানগর পুলিশের হিসাবে, ২০২১ সালে মহানগরে খুন হয় ১৫টি। ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি। এরপর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়ায় ২৯। ২০২৫ সালে হয় ৩৪। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে—এই পাঁচ মাসেই খুন হয়েছে ১৬টি। মহানগরের বাইরেও একই চিত্র। খুলনা জেলায় ২০২১ সালে খুনের মামলা হয় ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি, ২০২৫ সালে ৪৯টি এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ২০টি।
বিএনপি সরকারের সময়ও খুন থামেনি
১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পরও খুনোখুনি থামেনি। ফেব্রুয়ারিতে খুলনা শহরে খুন হয়েছে ৪টি, মার্চে ৪টি, এপ্রিলে ২টি ও মে মাসে ৫টি। এর বাইরে হত্যাচেষ্টার ঘটনাও আছে। গত ২১ মে বটিয়াঘাটা উপজেলার পুঁটিমারী বাজারে জলমা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি কার্যালয়ে ঢুকে গুলি করা হয়। এতে যুবদলের দুই কর্মী আহত হন।
নিরাপত্তাহীনতায় জনজীবন
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ‘ভঙ্গুর’ উল্লেখ করে মহানগর বিএনপির সভাপতি এস এম শফিকুল আলম (মনা) প্রথম আলোকে বলেন, মানুষের নিরাপত্তা নেই। প্রকাশ্যে মানুষকে খুন করা হচ্ছে। যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তির ওপর হামলা হচ্ছে, গুলির ঘটনা ঘটছে, চাঁদাবাজি হচ্ছে। এগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। বিএনপির নেতা বলেন, খুলনায় কিশোর গ্যাং ও মাদকের সিন্ডিকেট তৎপর হয়ে উঠেছে। বিষয়টি তাঁরা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বারবার বলেছেন। কিন্তু পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।
ভয়ের সংস্কৃতি ও মামলা না হওয়া
পুলিশের সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ ও এপ্রিলে ১৫ ধরনের অপরাধে দেশের ৮টি মহানগর পুলিশের ইউনিটের মধ্যে সর্বনিম্ন মামলা হয়েছে খুলনা মহানগরে—মার্চে ১০৫টি, এপ্রিলে ১১৪টি। স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য, এই পরিসংখ্যান অপরাধের প্রকৃত চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। অপরাধের সব ঘটনায় মামলা হয় না। এর পেছনে কাজ করে ভয়ের সংস্কৃতি। মাসুম বিল্লাহকে হত্যার দুই মাস পর গত ১৩ মে হত্যার ঘটনাস্থল সেই জুতার দোকানে গেলে তিন কর্মীকে পাওয়া যায়। হত্যাকাণ্ডের কথা তুলতেই তাঁরা চুপ হয়ে যান। দোকানের ব্যবস্থাপক দীপঙ্কর বাহাদুর প্রথমে বলেন, তিনি ‘কিছুই দেখেননি’। অথচ সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে তাঁর সামনেই ঘটনাটি ঘটতে দেখা যায়। বিষয়টি বলতেই তিনি সংক্ষেপে বলেন, ‘এ বিষয়ে কথা বলা নিষেধ।’
আদালতপাড়ায়ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই
মাসুম বিল্লাহ হত্যার তিন মাস আগে খুলনা জেলা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন নামের দুই ব্যক্তিকে। তাঁরা আদালতে মামলার হাজিরা দিয়ে বের হচ্ছিলেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আদালতপাড়া ও ডাকবাংলোর ঘটনা দেখিয়েছে, খুলনায় জনসমাগম, এমনকি আদালতপাড়ায়ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারছে না প্রশাসন।
পুলিশের সক্ষমতার ঘাটতি
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, শহরের খুনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে। এসব ঘটনায় খবর পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিহত ব্যক্তিদের কারও কারও সঙ্গে অতীতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও জানান কেএমপির কমিশনার। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চেহারা দেখিয়ে প্রচারণা চালালেও কেন গ্রেপ্তার হচ্ছে না—এ প্রশ্নে পুলিশের সক্ষমতার কিছুটা ঘাটতি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন কেএমপি কমিশনার। পুলিশের একটি অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে তথ্য দেওয়া ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগ আছে। তবে এ অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।
ভাই, আমাকে জানে মাইরেন না
গত ৮ মে চারটি মোটরসাইকেলে চড়ে সন্ত্রাসীরা আজিজুল ইসলাম নামের এক যুবককে তুলে নেয়। সাচিবুনিয়া বাজার থেকে তাঁকে রাঙ্গেমারীর ভেতরের দিকে নেওয়া হয়। খুলনা নগরের জিরো পয়েন্ট থেকে প্রায় সোয়া চার কিলোমিটার দূরের এলাকাটি বটিয়াঘাটা, লবণচরা ও হরিণটানা থানার মিলনস্থল। ১১ মে ঘটনাস্থলে গিয়ে বোঝা যায়, আশপাশের মানুষের মধ্যে এখনো চাপা আতঙ্ক রয়েছে। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। ঘটনার দিন দূর থেকে আজিজুলের আর্তচিৎকার শুনেছেন বলে জানান স্থানীয় তিন ব্যক্তি। তাঁদের ভাষ্য, আজিজুল তখন বলছিলেন, ‘ভাই, আমাকে জানে মাইরো না। আমার ছোট ছোট দুইটা বাচ্চা আছে। আমি কিছু করি নাই।’ দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যাওয়ার আগে সন্ত্রাসীরা দুটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
সন্ত্রাসী ৯টি গ্রুপ নিয়ে বেশি আলোচনা
সন্ত্রাসী দলগুলোর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন ও তাঁদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন, এমন আটজন এবং এখনো যোগাযোগ রয়েছে, এমন তিনজনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলেছে এই প্রতিবেদক। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, খুলনা মহানগর ও জেলায় এখন ৯টি সন্ত্রাসী গ্রুপের নাম বেশি আলোচিত। এগুলো হলো রনি চৌধুরী ওরফে গ্রেনেড বাবুর বি-কোম্পানি, শেখ পলাশের পলাশ গ্রুপ, হুমায়ুন কবীরের হুমা বাহিনী, আশিক বাহিনী, নূর আজিম গ্রুপ, টেংকি শাওন গ্রুপ, আরমান শেখের আরমান গ্রুপ, শাকিল শেখের শাকিল গ্রুপ ও নাসিমুল গণির নাসিম গ্রুপ। এর বাইরে দিঘলিয়া, আড়ংঘাটা, কয়রা, পাইকগাছা ও দাকোপ এলাকায় ছোট ছোট কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে।
বি-কোম্পানি: দাউদ ইব্রাহিমের অনুকরণে
খুলনার সাম্প্রতিক অপরাধজগতে সবচেয়ে আলোচিত নাম গ্রেনেড বাবু। তাঁর আসল নাম রনি চৌধুরী ওরফে বাবু। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র বলছে, ২০০৪ সালে খুলনা সিটি করপোরেশনের তৎকালীন মেয়র শেখ তৈয়েবুর রহমানের গাড়িতে গ্রেনেড হামলার পর থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘গ্রেনেড’ শব্দটি জুড়ে যায়। এখন তিনি সন্ত্রাসী গ্রুপটির নাম দিয়েছেন ‘বি-কোম্পানি’। মুম্বাইভিত্তিক অপরাধজগতের ‘ডন’ দাউদ ইব্রাহিমের বাহিনীর নাম ‘ডি কোম্পানি’। সেই অনুকরণে বি-কোম্পানি নামকরণ বলে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এই সন্ত্রাসী গ্যাংয়ের নেতা নিজেকে ‘নবাব’ নামেও পরিচয় দেন। তিনি বিদেশে বসে সন্ত্রাসী দলটি পরিচালনা করেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি।
বাবু-পলাশ দ্বন্দ্ব
গ্রেনেড বাবুর পাশাপাশি আরেক আলোচিত নাম শেখ পলাশ। তিনি একসময় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পলাশ খুলনায় ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। মিস্ত্রিপাড়া, বানরগাতি, আরামবাগ, নিরালা, পশ্চিম বানিয়াখামার, রূপসা বাগমারা ও সোনাডাঙ্গা এলাকায় তাঁর প্রভাব ছিল বেশি। এ সময় বাবু ও পলাশ ছিলেন ‘সমানে সমান’। অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একজন আরেকজনের অনুসারীকে খুন করতে থাকেন। একপর্যায়ে বাবু কিছুটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ চার ঘণ্টার অভিযানে যৌথ বাহিনীর হাতে খুলনার সোনাডাঙ্গা থেকে ১০ সহযোগী এবং অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন শেখ পলাশ। সেদিন তাঁর দলের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোলাগুলিও হয়। পলাশ গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাবু আবার অপরাধজগতের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। ৩০ নভেম্বর আদালত চত্বরে যে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়, তাঁরা পলাশের অনুসারী ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে।
ফেসবুকে সন্ত্রাসীদের প্রচারণা
সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো খুলনায় এতটা নিরাপদ পরিবেশ পেয়েছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা নিজেদের পক্ষে প্রচারণা চালায়। সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর এমন অন্তত ১৩টি ফেসবুক পেজ ও আইডির খোঁজ পেয়েছে প্রথম আলো। এসব পেজ থেকে বিভিন্নজনকে ইঙ্গিত করে খুনের হুমকি ও প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে নানা পোস্ট দেওয়া হয়। সন্ত্রাসী গ্রুপের নামে পোস্টার টাঙিয়ে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জড়ো হয়ে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে পোস্ট করা হয়। সর্বশেষ ঈদুল আজহাতেও এমন প্রচারণা দেখা গেছে। এসব ঘটনায় সবার চেহারা স্পষ্ট হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পুলিশকে নির্বিকার ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
সামাজিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে সন্ত্রাস
সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি কথিত সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালনা করে বি–কোম্পানি। খুলনার শিববাড়ী মোড়ে গত এপ্রিল মাসে রীতিমতো বি–কোম্পানির নামে ব্যানার টানিয়ে গরমের মধ্যে ঠান্ডা পানি বিতরণ করা হয়। এ ঘটনার ভিডিও সন্ত্রাসী গ্রুপটির বিভিন্ন ফেসবুক পেজে প্রচার করে। এর আগে গত রমজানে গরিবদের মধ্যে ইফতারি এবং ঈদসামগ্রী বিতরণ করে সেটা ফেসবুক পেজে প্রচার করেছিল বি-কোম্পানি। এসব প্রচারণায় প্রায়ই দেখা যায় একটি বাক্য, ‘দোয়া মে ইয়াদ রাখনা’। স্থানীয় ব্যক্তিরা মনে করেন, এসব তৎপরতা এলাকায় উপস্থিতি জানান দেওয়ার কৌশল। যারা নিয়মিত খুনোখুনি করছে, তারাই আবার সামাজিক কাজের ছবি ছড়ায়। এতে দরিদ্র মানুষের একটি অংশ বিভ্রান্ত হয়; অপর দিকে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো নানাভাবে তাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করার সুযোগ পায়।
অস্ত্র ও ভাড়াটে খুন
খুলনার অপরাধজগতের সদস্যরা ঢাকা, গাজীপুর ও সাভার এলাকায় গিয়েও ভাড়ায় খাটছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে। গত মার্চে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় রাকিবুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় খুলনার সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা হয়েছিল বলে ডিএমপির তদন্তে উঠে এসেছে। ডিএমপির রমনা বিভাগের তৎকালীন উপকমিশনার মাসুদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, রাকিবুল হত্যার দিন ৮–১০ জনের একটি দল ঘটনাস্থলে এসেছিল। তারা খুলনার বি কোম্পানির সদস্য। তাঁর ভাষ্য, এরা মূলত ভাড়ায় খাটা সন্ত্রাসী; টাকার বিনিময়ে নির্দেশ পেলে হামলা বা হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এর আগেও এমন বহু ঘটনায় তারা জড়িত ছিল।
অভিযান আছে, আস্থা নেই
খুলনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বারবার অভিযানের কথা জানিয়েছে। সন্দেহভাজন গ্রেপ্তারও করেছে। তবে অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও আশ্রয়দাতারা ধরা পড়ছেন কম। কেউ ধরা পড়লেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধজগতে সক্রিয় হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতেও ভয় পায়। আদালতে গেলে অনেক মামলায় সাক্ষী পাওয়া যায় না। স্থানীয় ব্যক্তিদের বড় অভিযোগ—অভিযানের আগেই অনেক সময় সন্ত্রাসীরা খবর পেয়ে যায়। পুলিশের ভেতরেও সন্ত্রাসীদের ‘ইনফরমার’ (তথ্যদাতা) আছে।
খুলনা মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু প্রথম আলোকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যে খুনোখুনি শুরু হয়েছে, এমন পরিবেশ চরমপন্থীদের সময়েও ছিল না। সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে খুন করছে, চেহারাও দেখা যাচ্ছে, অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধরা পড়ছে না। মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ডাকবাংলো মোড়ের ঐতিহ্যবাহী রহমানিয়া হোটেলে ১৯৮৭ সাল থেকে কাজ করেন মো. শহীদুল ইসলাম। তাঁর স্মৃতিতে খুলনার বহু রূপ জমা আছে। তিনি বলেন, এরশাদ শিকদারের ফাঁসির পর খুলনার মানুষের মধ্যে স্বস্তি ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে মানুষের নিরাপত্তা নেই। যখন যাকে খুশি গুলি করে, কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘খুলনা এখন আতঙ্কের শহর।’



