ডিপ স্টেটের প্রস্তাব ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া একটি গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ডিপ স্টেট নামক অদৃশ্য শক্তি অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার প্রস্তাব দিয়েছিল। এই প্রস্তাবের মধ্যে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট শাসনকে বৈধতা দেওয়ার মতো শর্তও ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আসিফ মাহমুদের দাবি ও প্রশ্ন
আসিফ মাহমুদ বলেন, 'আমরা কিন্তু সেটাতে সায় দিইনি। আমরা সব সময় গণতন্ত্রকেই সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি কমিটমেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল বলেই নির্বাচনটা হয়েছে।' তাঁর মতে, ডিপ স্টেটের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এটি কি আসিফ মাহমুদের আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা, নাকি বাস্তব ঘটনা?
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ডিপ স্টেট বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দীর্ঘায়িত করে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'তাদের সাজাগুলো আদালতের মাধ্যমে লেংদি করে আপনারা তো জানেন, সেটা কীভাবে করা যায়।'
ডিপ স্টেট কী এবং এর বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
ডিপ স্টেট হলো রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে কাজ করা একটি অদৃশ্য শক্তি। এটি সাধারণত প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী, সামরিক বাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থায় সক্রিয় থেকে সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। যুক্তরাষ্ট্রের লেখক মাইক লোফগ্রেনের মতে, ডিপ স্টেট একটি দোআঁশলা কাঠামো, যা আমলাতন্ত্র, আর্থিক শক্তি ও সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডিপ স্টেটের ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়। তুরস্ক, মিসর বা পাকিস্তানের মতো দেশে ডিপ স্টেটের জোরদার ভূমিকা রয়েছে। দুর্বল গণতন্ত্র বা স্বৈরশাসনের দেশগুলোয় সরকার ডিপ স্টেটকে ব্যবহার করে শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং বিরোধীদের দমন করতে।
শেখ হাসিনার আমলে ডিপ স্টেটের ভূমিকা
শেখ হাসিনার গত ১৫ বছরের শাসনামলে ক্রসফায়ার, গুম বা আয়নাঘরে আটকে রাখার ঘটনাগুলো ডিপ স্টেটের মাধ্যমেই ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থায় নিজস্ব লোক তৈরি করে এই কাজগুলো করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকেই ডিপ স্টেটের কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
বাংলাদেশে শুধু শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনে নয়, ডিপ স্টেট বরাবরই সক্রিয় থেকেছে। সব সরকারই তাদের কাজে লাগিয়েছে। তবে শেখ হাসিনার শাসনে তা সব মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। তাঁর সরকার পুরোপুরি ডিপ স্টেটনির্ভর হয়ে পড়ে এবং তিন তিনটি জোচ্চুরিমূলক নির্বাচনও ডিপ স্টেটের সহায়তায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ডিপ স্টেটের কার্যক্রম
আসিফ মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, ডিপ স্টেট অন্তর্বর্তী সরকারকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখতে চেয়েছিল তাদের কিছু নির্দিষ্ট স্বার্থ রক্ষার বিনিময়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে বিভিন্ন সময়ে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি ডিপ স্টেটের সুনির্দিষ্ট সদস্যদের নাম উল্লেখ করতে অস্বীকার করেন, যা এই অভিযোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন অংশে ডিপ স্টেটের প্রভাব ছিল বলে ধারণা করা হয়। সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থায় এমন কিছু ব্যক্তি সক্রিয় ছিলেন, যাঁরা সরকারে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন।
তদন্ত ও বিচারের দাবি
বর্তমান নির্বাচিত সরকারের উচিত এই 'অন্তর্বর্তী ডিপ স্টেট'-এর ব্যাপারে তদন্ত করা। এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে, তারা যদি কোনো বেআইনি কাজ বা অপকর্ম করে থাকে, তাহলে বিচারের মুখোমুখি করা। জাতীয় নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা বা রাষ্ট্রের স্বার্থের দোহাই দিয়ে ডিপ স্টেটের অপকর্মকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা অতীতেও ভালো ফল দেয়নি, সামনেও দেবে না।
ডিপ স্টেট একটি বাস্তবতা হতে পারে, কিন্তু কোনো কিছুই শেষ বিচারে জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। আসিফ মাহমুদের দাবি যদি সত্য হয়, তাহলে অন্তর্বর্তী আমলে ডিপ স্টেটের এই ভূমিকা দেশের স্বার্থ ও গণতন্ত্রবিরোধী। এখন আমাদের জানা দরকার, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সক্রিয় এই 'ডিপ স্টেট'-এ কারা তৎপর ছিলেন এবং তাঁরা এখন কোথায় আছেন।



