মানিকগঞ্জ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা
মানিকগঞ্জ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে বিমানমন্ত্রী রিতা

মানিকগঞ্জ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে বিমানমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা

ইতিহাস কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের তালিকা নয়, এটি ধারাবাহিকতার গল্প। সেই ধারাবাহিকতায় পিতা ছিলেন এক সফলতা অধ্যায়ে, ঠিক কন্যা যুক্ত হয়েছেন আকাশ পথের নতুন অধ্যায়ে। মানিকগঞ্জের রাজপথ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আফরোজা খানম রিতা। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম আনুষ্ঠানিক সভাতেই স্পষ্ট হুশিয়ারি বার্তায় জানান দিলেন হজযাত্রীদের কোনো ধরনের হয়রানি সহ্য করা হবে না।

বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি নতুন মন্ত্রী

মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সামনে এখন একগুচ্ছ বড় চ্যালেঞ্জ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আর্থিক ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা, ভাড়া কাঠামো যৌক্তিক করা, ফ্লাইট বিলম্ব ও সূচি বিপর্যয় কমানো, যাত্রীসেবার মান উন্নয়ন—এসব এখন আলোচনার কেন্দ্র। পাশাপাশি নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু, পুরোনো রুট পুনরায় সক্রিয় করা এবং দেশের বিমানবন্দরগুলোর আধুনিকায়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াও বড় দায়িত্ব। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও এভিয়েশন সেফটি মান বজায় রাখা নিয়েও কাজ করতে হবে সমান গুরুত্ব দিয়ে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শিল্প ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে তিনি এসব ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন।

রাজনৈতিক উত্থান ও পারিবারিক প্রভাব

রাজনৈতিকভাবে তার উত্থানও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। রাজনীতিতে সাবেক মন্ত্রী বিশ্ব সেরা সিরামিক ব্যান্ড মুন্নু সিরামিকের প্রতিষ্ঠাতা হারুনার রশীদ খান মুন্নু একটি পরিচিত নাম। সফল শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পরপর একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া সফল শিল্পোদ্যোক্তা হারুনার রশীদ খান মুন্নুর কন্যা হিসেবে রাজনীতিতে তার পথচলা শুরু। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মানিকগঞ্জ-২ ও মানিকগঞ্জ-৩—দুটি আসনে জয় পেয়ে মুন্নু যে নজির গড়েছিলেন, তা এখনো আলোচনায়। পরে তিনি মানিকগঞ্জ-৩ আসন রেখে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং চারদলীয় জোট সরকারের দফতরবিহীন মন্ত্রী হন। এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালেও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। শিল্প ও রাজনীতির মিশেলে তৈরি সেই প্রভাব দীর্ঘদিন মানিকগঞ্জের রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে।

সেই রাজনৈতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠা আফরোজা খানম রিতা মাঠের রাজনীতি থেকে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। দলীয় দুঃসময়ে সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক কাজে সম্পৃক্ততা এবং নেতাকর্মীদের পাশে থাকা তাকে স্থানীয় রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান এনে দেয়। প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েই তিনি আলোচনায় আসেন। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে রেকর্ড ভোটে জয় তাকে জাতীয় পরিসরে পরিচিত করে তোলে। নারী প্রার্থীদের মধ্যে বড় ব্যবধানে বিজয়ের তালিকায় তার নাম উঠে আসে, যা তার সাংগঠনিক শক্তিরই ইঙ্গিত বহন করে।

প্রথম নারী পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। স্বাধীনতার পর এই মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো একজন নারী পূর্ণমন্ত্রী দায়িত্ব পেলেন। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, কার্গো পরিবহণ, হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন সব মিলিয়ে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতের নেতৃত্ব এখন তার হাতে। এই দায়িত্বকে অনেকেই রাজনৈতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা রিতা বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও জেলা বিএনপির আহ্বায়কেরও দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি মুন্নু গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান। শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অভিজ্ঞতা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে বলে দলীয় নেতাদের বিশ্বাস।

পরিবারের শিক্ষা ও শিল্পে অবদান

পরিবারও শিল্প ও শিক্ষায় অনন্য। তার স্বামী মইনুল ইসলাম মুন্নু গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। বড় ছেলে মাইমুনুল ইসলাম অন্তু লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে মুন্নু সিরামিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মেজ ছেলে রাশীদ সামিউল ইসলাম অর্ক লন্ডনের একই প্রতিষ্ঠান থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে মুন্নু ফেব্রিক্স লিমিটেডে দায়িত্ব পালন করছেন। ছোট ছেলে রাশীদ রাফিউল ইসলাম অর্নব সিটি ইউনিভার্সিটি লন্ডন থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উচ্চশিক্ষা নিয়ে মুন্নু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নির্বাহী পরিচালক।

রাজনৈতিক সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

রাজনীতির পথ তার জন্য মসৃণ ছিল না। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে গিয়ে মামলা ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। তবু সংগঠন ধরে রাখা, নেতাকর্মীদের পাশে থাকা এবং আর্থিক সহায়তা দেওয়া তাকে জেলা রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান দিয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রতিকূল সময়েই নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায়।

বড় ছেলে লন্ডন ইমপেরিয়াল কলেজ থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করা মাইমুনুল ইসলাম অন্তু বলেন, তার মা সততা ও নিষ্ঠাকে রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়েছেন। দুঃসময়ে দলের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে ব্যবসায়িক ক্ষতিও হয়েছে, কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাননি। পরিবারের কাছে মন্ত্রিত্ব কেবল একটি পদ নয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার স্বীকৃতি।

এখন চোখ জাতীয় আকাশপথে। বিমানমন্ত্রী হিসেবে আফরোজা খানম রিতার সামনে পরীক্ষার সময়। হজ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিমান সংস্থার আর্থিক পুনর্গঠন—প্রতিটি সিদ্ধান্তই প্রভাব ফেলবে মানুষের জীবনে। মানিকগঞ্জ থেকে শুরু হওয়া যাত্রা এখন জাতীয় দায়িত্বে পরিণত। সেই দায়িত্ব কতটা সফলভাবে তিনি বহন করতে পারেন, সেটিই সময়ের অপেক্ষা।