সোহাগ হত্যার এক বছরেও বিচার হয়নি, মানববন্ধনে দ্রুত ব্যবস্থার দাবি
সোহাগ হত্যার এক বছরেও বিচার হয়নি, মানববন্ধনে দাবি

রাজধানীর মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যার এক বছর পূর্তিতে পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার, ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। বুধবার (৯ জুলাই) সকাল ১১টায় মিটফোর্ড হাসপাতালের গেটের সামনে নিহত সোহাগের পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত এ মানববন্ধনে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকাবাসীসহ প্রায় শতাধিক মানুষ অংশ নেন।

এক বছরেও বিচার প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি নেই

মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, এক বছর পেরিয়ে গেলেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। মামলার পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মামলা তুলে নিতে পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং প্রাণনাশ ও অপহরণের হুমকি দিচ্ছে। তারা পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার, ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার, পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।

নিহত সোহাগের ভাগ্নি ও মামলার বাদীর মেয়ে বিথী বলেন, গত ৯ জুলাই ২০২৫ সালে ঠিক এই স্থানেই চাঁদাবাজদের হামলায় পাথর নিক্ষেপ করে তার মামা সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তিনি জানান, মামলায় প্রথমে ২৪ জনকে আসামি করা হলেও তদন্ত শেষে চারজনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে ২০ জন এজাহারভুক্ত এবং ২১ জন চার্জশিটভুক্ত আসামি রয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকলেও আটজন এখনো পলাতক।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ

তিনি অভিযোগ করেন, পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। শারাফাত নামে এক পলাতক আসামি প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নিয়মিত পরিবারকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছেন এবং নিজেকে জামিনে মুক্ত বলে দাবি করছেন। তবে পরিবারের কাছে তার জামিনের কোনো কাগজপত্র নেই। একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে বিষয়টি জানার পর কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জামিনের কথা বললেও পরিবার এখনো তার কোনো প্রমাণ পায়নি।

বিথী অভিযোগ করেন, ইমরান নামে এক ব্যক্তি শুরু থেকেই মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও তার বাবার নাম ও বয়স পরিবর্তন করে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অব্যাহতির পর তিনি পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার করছেন, এলাকা ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন এবং সোহাগকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাদেরও একইভাবে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দিচ্ছেন।

তিনি বলেন, এক বছরেও মামলার বিচার কার্যক্রমে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না। এটি পুলিশের ব্যর্থতা, অবহেলা নাকি অন্য কোনো কারণে হচ্ছে—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি। পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তার কারণে তাদের পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ঘটনার পর সরকার ও আইনমন্ত্রী দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরিবার সেই আশ্বাসে আস্থা রাখলেও এক বছরেও তার বাস্তবায়ন হয়নি।

রাজনৈতিক পরিচয় ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি

বিথী বলেন, অধিকাংশ আসামি নিজেদের বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করলেও তারা দলের কোনো পদ-পদবিতে নেই; তারা মূলত দুষ্কৃতকারী এবং দলের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যারা দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধ করছে, তাদের আইনের হাতে তুলে দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে কোনো অন্যায়ের স্থান নেই। প্রকৃত অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হলে জনগণের আস্থা আরও বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, পলাতক আসামিরা বুক ফুলিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে। তিনি সরকার, আইনমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানান। একই সঙ্গে আলোচিত রামিশা হত্যা মামলার মতো সোহাগ হত্যা মামলার বিচারও দ্রুত ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

গ্রেফতার হওয়া ১৩ আসামির প্রসঙ্গে বিথী বলেন, তারা বিভিন্নভাবে জামিনের চেষ্টা করছে। কিন্তু এত নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকেই জামিন দেওয়া উচিত নয়। সোহাগকে যেভাবে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করা হয়েছে, সেই ভিডিও কয়েক সেকেন্ডের বেশি কেউ দেখতে পারে না। ঘটনাটি দেশ-বিদেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তাই সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি, বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

দুই নম্বর আসামি হোসেন টিটুর প্রসঙ্গ

দুই নম্বর আসামি হোসেন টিটুর বিষয়ে তিনি বলেন, টিটু এখনো গ্রেফতার হননি। তিনি অনলাইনে ফোন করে নিয়মিত ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন এবং দাবি করছেন যে আইনের সহায়তায় তিনি বেরিয়ে আসবেন। তবে তিনি বাংলাদেশের আইনের প্রতি আস্থা রেখে বলেন, আইন এতটা দুর্বল নয় যে একজন নির্মম হত্যাকাণ্ডের আসামিকে শাস্তি ছাড়াই ছেড়ে দেবে। তার দাবি, টিটু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এবং প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন। একজন হত্যা মামলার আসামি কীভাবে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান—সে প্রশ্নও তিনি প্রশাসনের কাছে রাখেন।

নিহত সোহাগের ছেলে সোহান বলেন, বাবাকে হত্যার এক বছর পার হলেও মামলার দুই নম্বর আসামি কারাগার হোসেন টিটুকে এখনো গ্রেফতার করা হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, টিটু নিয়মিত তাদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। ফলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তিনি দ্রুত টিটুকে গ্রেফতারের দাবি জানান। একই সঙ্গে বলেন, ঘটনার পর প্রথমদিকে ১৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করা হলেও এরপর আর কোনো পলাতক আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি। কেন বাকি আসামিদের ধরা হচ্ছে না, সেটিও তদন্ত করে দেখার দাবি জানান। পাশাপাশি তিনি দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে পরিবারকে ন্যায়বিচার দেওয়ার আহ্বান জানান।

পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক

নিহত সোহাগের মেয়ে সোহানা বলেন, বাবার মৃত্যুর এক বছর হয়ে গেলেও পরিবার বিচার পায়নি। শুরুতে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হলেও এরপর আর কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি। পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তিনি অভিযোগ করেন, মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাকে ও তার ভাইকে অপহরণ করে জিম্মি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব হুমকির কারণে তারা চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

মামলার বাদী ও নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জু আরা বেগম বলেন, এক বছর পেরিয়ে গেলেও তার ভাই হত্যার বিচার হয়নি। দুই নম্বর আসামি কারাগার হোসেন টিটুসহ পলাতক আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, আসামিরা তার স্বামীকে অপহরণের হুমকি দিচ্ছে। তা সম্ভব না হলে সোহাগের ছেলে কিংবা মেয়েকে অপহরণ করে তাকে জিম্মি করে মামলা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। দুই এতিম সন্তানকে নিয়ে তিনি চরম আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছেন বলে জানান। অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও নিজেই সন্তানদের স্কুলে আনা-নেওয়া করেন।

সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, সোহাগকে যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেই ঘটনার ভিডিও একবার দেখলেই এর ভয়াবহতা বোঝা যাবে। তিনি দ্রুত বিচার, পলাতক আসামিদের গ্রেফতার এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তিনি বলেন, সরকার অন্যায়ের পক্ষ নেবে না—এমন বিশ্বাস তার রয়েছে। সোহাগ হত্যার বিচার হলে শুধু তাদের পরিবার নয়, দেশের মানুষও আইনের প্রতি আস্থা ফিরে পাবে। দীর্ঘদিন ধরে তারা একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে আসলেও তার ভাইয়ের হত্যার বিচার না হলে সেই কষ্ট সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।