লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন বোনকে দা দিয়ে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদার ইসকনের সদস্য ও বিবাহিত ছিলেন বলে জানিয়েছেন তার চাচাতো ভাই টিটু মজুমদার। অন্যদিকে, নিহতের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম ওরফে সিফাত (১৮) জানান, অন্তর প্রায় এক বছর আগে তাদের ভবনের চতুর্থ তলায় এক মেয়ের সঙ্গে থাকতেন। তিনি বলেন, ‘আমরা জানতাম ঘাতক ও তার স্ত্রী মুসলিম। তারা নামাজও পড়ত। ঘাতকের মাথায় টুপিও থাকত, তার স্ত্রী পরিচয়ে মেয়েটি মাঝে মাঝে বোরকাও পড়ত; কিন্তু মা ও বোনদের হত্যার পর অন্তর মজুমদার নাম শুনেই আমি হতবাক।’
ঘটনার বিবরণ ও হতাহত
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল ৮টায় লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ধানহাটা এলাকার নদীর পাড়ের একটি ভাড়া বাসায় ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সিফাতের মা শাহিনুর বেগম (৩৮) এবং তার তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২০), নাফিসা আক্তার ইকরা (১৭) ও ফাতেমা আক্তার সিপা (৯)। পরিবারটিতে কেবল বেঁচে রয়েছেন সিফাত। সিফাতের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া গ্রামে। শুক্রবার রাত ১০টায় গ্রামটির মেঘনা নদীর পাড়ে সামাজিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।
অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের পরিচয়
খুনের ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে গণপিটুনি দেন। পরে আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অন্তর নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার ছারামন উল্লাহ ইউনিয়নের চর ফজলুল করিম গ্রামের সুজিৎ মজুমদার ও আম্পরি মজুমদারের ছেলে। তার চাচাতো ভাই টিটু মজুমদার মোবাইলে জানান, অন্তর তার এলাকায় কয়েকজন তরুণীর সঙ্গে খারাপ আচরণের কারণে গ্রাম ও পরিবার থেকে বিতাড়িত ছিলেন। তিনি ইসকনের সদস্য ও বিবাহিত ছিলেন।
সিফাতের বক্তব্য ও মানববন্ধন
রোববার (২৮ জুন) বিকালে রায়পুরে ফিরে সিফাতের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ‘আমি বাসার পাশে যে দোকানে চাকরি করি, সেখান থেকে ছুটে এসে বাসায় ঢুকতেই দেখি আমার মা রান্নাঘরে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছেন। পাশের কক্ষে তিন বোনের রক্তাক্ত দেহ। পুরো ঘর রক্তে ভেসে গিয়েছিল। সেই দৃশ্য আমি কোনোভাবেই ভুলতে পারছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর একসময় আমাদের ভবনের ওপরের তলায় ভাড়া থাকত। সেই কারণে দু-একবার কথা হয়েছে। এর বাইরে তার সঙ্গে আমাদের কোনো ঘনিষ্ঠতা বা বিরোধ ছিল না। মা ও তিন বোনকে হত্যার ঘটনায় অন্তরের নাম শুনে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি। কেন সে এমন ঘটনা ঘটাবে, তা এখনো বুঝতে পারছি না।’
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ একটি ধারাল ছেনি (ধারাল অস্ত্র) আলামত হিসেবে জব্দ করেছে। সিফাতের দাবি, ওই ধারালো অস্ত্র তাদের বাসার নয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসায় কোনো ছেনি ছিল না। আমার ধারণা, অন্তর হত্যার উদ্দেশ্যে তার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল।’
এদিকে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও ঘাতকদের গ্রেফতারের দাবিতে রোববার বিকাল সাড়ে ৫টায় রায়পুর ট্রাফিক মোড়ে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন করেন রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ছাত্র সমাজের লোকজন।
পুলিশ তদন্ত ও মামলা
রায়পুর থানার ওসি শাহীন মিয়া বলেন, মা ও তিন মেয়েকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে পুলিশ। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনায় নিহতদের ছেলে জিহাদুল ইসলাম শিফাত বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামিদের নামে হত্যা মামলা এবং অভিযুক্তকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যায় ও এ সময় তাকে বাঁচাতে গিয়ে ৭ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় এসআই আমিনুল ইসলাম বাদী হয়ে অজ্ঞাতদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এ দুটি হত্যা মামলাই তদন্ত করছেন পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আবদুল মান্নান।
সংসদ সদস্যের সান্ত্বনা ও প্রতিশ্রুতি
শনিবার রাতে সিফাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা দেন কুমিল্লা-২ আসনের (হোমনা-তিতাস) সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। এছাড়াও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদর একাংশ) আসনের এমপি আবুল খায়ের ভুঁইয়া। এ সময় সিফাতকে কুমিল্লায় ফিরিয়ে নিয়ে এসে তার লেখাপড়াসহ সার্বিক খরচের দায়িত্ব নিতে চান বলে জানান সংসদ সদস্য সেলিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, মা ও তিন বোন নিহত হওয়ার পর লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে বসবাস সিফাতের জন্য নিরাপদ নয়। সিফাতকে পৈতৃক সম্পত্তি দ্রুত বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য তার চাচা ও গ্রামবাসীকে অনুরোধ জানান এমপি। লক্ষ্মীপুরের জেলা পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলে হত্যাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করার তাগিদও দেন তিনি।



