ঢাকার আশুলিয়ার তুরাগ নদের ট্রলার ঘাটে ২২ জুন পুলিশি ধাওয়ার মুখে ট্রলার থেকে কয়েকজন নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন লাশ উদ্ধার হওয়া এক কিশোরের স্বজন ও ঘটনাস্থলে থাকা দুই প্রত্যক্ষদর্শী। ওই ঘটনার পর নিখোঁজ থাকা দুজনের মরদেহ পরে তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার বিবরণ
২২ জুন বিকেলের পর থেকে নিখোঁজ ছিলেন ঢাকার তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা মো. সুমন (১৭) এবং আরিফ হাসান রাকিব (২০)। মো. সুমনের মরদেহ আশুলিয়া থেকে গত শুক্রবার এবং বুধবার আরিফ হাসান রাকিবের (২০) মরদেহ উদ্ধার করেছে আশুলিয়া থানা ও আমিনবাজার নৌ পুলিশ। এ দুজন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। এ ছাড়া বুধবার বিকেলে তুরাগ নদ থেকে রনি মোল্লার (৩৫) মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। তবে রনির বাবা কফিল উদ্দিন জানান, গোসল করতে গিয়ে পানিতে ডুবে রনির মৃত্যু হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
মারা যাওয়া কিশোর সুমনের খালু মো. জুয়েল বাবু বলেন, ২২ জুন সুমন নিখোঁজ হওয়ার পর খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে ওই দিন (২২ জুন) সুমনের সঙ্গে ছিল এমন কয়েকজনের কাছ থেকে ঘটনা জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, সুমনের সঙ্গীরা জানিয়েছেন, সুমন ২২ জুন আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) একটি মিছিলে গিয়েছিল। মিছিল শেষে তুরাগ নদের রোস্তমপুর ঘাট থেকে একটা ট্রলার ভাড়া করেন তাঁরা। আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যান। সেখানে যাওয়ার পর পুলিশ ধাওয়া করে। সুমনসহ কয়েকজন পানিতে ঝাঁপ দেন। এ সময় ৭ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
যারা তথ্য জানিয়েছে তারা সবাই এখন পলাতক উল্লেখ করে জুয়েল বাবু বলেন, ‘সুমন সাঁতার জানত না। এর পর থেকে সে নিখোঁজ ছিল। এরপর বিভিন্ন জায়গায় আমরা খোঁজাখুঁজি করি। একবার শুনতে পেয়েছিলাম সুমনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। পরে নিশ্চিত হই সে অ্যারেস্ট হয়নি।’
জুয়েল বাবু আরও বলেন, ‘আমরা ট্রলার নিয়ে তুরাগের বিভিন্ন এলাকা খোঁজাখুঁজি করেছি। তুরাগ ও আশুলিয়া থানা–পুলিশের কাছে গিয়েছি। পুলিশ আমাদের ঘটনার বিষয়ে কিছুই বলে নাই। ২৩, ২৪, ২৫ আমরা তিন দিন ট্রলার নিয়ে খুঁজছি। ২৫ তারিখ রাত সাড়ে ১২টার দিকে পুলিশ আমাদের জানায়, জেলেরা নাকি একটা লাশ ভাসতে দেখেছে। লাশ উদ্ধারের পর আমরা সেটি সুমনের লাশ বলে নিশ্চিত হই।’
রোববার বেলা সোয়া ২টার দিকে আশুলিয়া বাজারের বাঁশপট্টিতে বসে থাকা ৫০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওই দিন (২২ জুন) পুলিশ এই দিক দিয়া গেছে। পুলিশ দেইখা লগে লগে ফাল মারছে। ওর যহন ফাল মাইরা মাইরা পরছে ওই সময় পুলিশ তাড়া করছে। আমরা ওই দোহানে বইসা চা খাচ্ছি এই টাইমে (বেলা সোয়া ২টার দিকে)। ওই দিক তাহাইছি। ৫-৭ জন দৌড় মারছে দেখছি। ভাবি, ব্যাপার কী, নদীতে মানুষ আসে আবার যায়। দুই ছ্যাড়ার কাছে জিগাইছি ওরা তো রা মা মারল না (কিছু বলল না)। পরে এক পিচ্চিরে জিগাইলাম, কইলো আমরা মিছিলে গেছিলাম। মিছিল থিকা এহানে আইছি ওমনে পুলিশ তাড়া দিছে।’
ওই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘কয়জন পানিতে লাফ দিছিলো তা কইতে পারুম না। তিনজনরে উঠতে দেখছি। পুলিশ মনে হয় ৭টারে ধইরা নিছিলো। নৌকায় বুলে মানুষ ছিল ৩০-৩৫ জন। কয়জন ঘাস খেতে পলাইয়া ছিল সন্ধ্যার পর আইছে। সাঁতরাইয়া কয়জন দূরে গিয়া উঠছে। পুলিশের ওইহানে গেছিলাম। পুলিশ ৭টারে নিয়া আইছে। এইহানে কাউরে কিছু কয় নাই। দড়ি দিয়া বাইন্দা রাখছে। পরে হ্যান্ডকাপ পরাইয়া নিয়া গেছে।’
পাশেই বসে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী অপর এক ব্যক্তি বলেন, ‘নদীতে লাফ দেওয়ার পর পুলিশ ওই নৌকা (ট্রলার) নিয়া কিছু দূর গেছিলো। এখন ওই ট্রলারের চালকও পালাতক।’
দুই মামলার এজাহারে যা রয়েছে
২২ জুন আশুলিয়া থানা–পুলিশের কাছে গ্রেপ্তার ৭ জনের বিরুদ্ধে পরদিন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয়। মামলার এজহারে বলা হয়েছে, ২২ জুন বেলা ৩টার দিকে আশুলিয়া থানার আশুলিয়া গরুর হাটের পাশে ট্রলার ঘাটের ওপর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং দলটির সহযোগী অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ৬০–৬৫ জন নেতা–কর্মী দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, এলাকার জনগণের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং দেশের অভ্যন্তরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে বলে জানতে পারে পুলিশ। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁদের প্রতিহত করে। পুলিশের বাধা পেয়ে আন্দোলনকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করার সময় সাতজন আটক হন।
মো. সুমনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় তার বড় ভাই মো. সালাউদ্দিন অপমৃত্যুর মামলা করেন। এতে বলা হয়েছে, মো. সুমন (১৭) ২২ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বন্ধুবান্ধবসহ ২০–২২ জন তুরাগ নদে নৌকা ভ্রমণের উদ্দেশে ধৌড় ব্রিজ ঘাট এলাকায় নৌকায় ওঠে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আশুলিয়া গরুর হাট ঘাটে তাড়াহুড়া করে নৌকা থেকে নামতে গিয়ে অসাবধানতাবশত সুমনসহ ৫–৬ জন নদীতে পড়ে যায়। সে সাঁতার জানত না। সাঁতার না জানার কারণে নদীতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই নদীর স্রোতে নদীতে ডুবে যায়। তার সঙ্গে থাকা লোকজন অনেক খোঁজাখুঁজি করে সুমনকে পায়নি। বিষয়টি সুমনের বন্ধুবান্ধবেরা জানান। পরে ২৬ জুন নদ থেকে ভাসমান অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়।
আইনজীবীর বক্তব্য
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া মামলার আসামিদের আইনজীবী আরিফ সরকার পাভেল প্রথম আলোকে বলেন, সুমনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের হওয়া অপমৃত্যুর মামলা এবং গ্রেপ্তার ৭ জনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার ঘটনার স্থান, সময় প্রায় একই। আসামিদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন তারা ২২ জুন মিছিলও করে। তুরাগ এলাকায় মিছিলের সময় তুরাগ থানা–পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীরা ধাওয়া দিলে ট্রলারে করে তারা আশুলিয়া ট্রলার ঘাটে যায়। পুলিশ ও বিএনপির নেতা-কর্মীরা সেখানে গিয়ে তাদের ওপর হামলা করলে অনেকে নদীতে লাফ দেয়। নদীতে লাফিয়ে পড়াদের লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। সেখান থেকে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের বক্তব্য
এদিকে মরদেহ উদ্ধার হওয়া দুজনের মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত কারণে হয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) শামীমা পারভীন। রোববার দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দুটি ঘটনাই দুর্ঘটনাজনিত। তবে একটি স্বার্থান্বেষী মহল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ঘটনাগুলো ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচার চালাচ্ছে। এসব অপপ্রচারকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ধরনের অপপ্রচার সম্পর্কে তথ্য থাকলে তিনি ঢাকা জেলা পুলিশকে জানানোর অনুরোধ জানান।
পুলিশ সুপার জানান, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে তিন মাসে ঢাকা জেলায় মোট ১৭০টি অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলাই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ উদ্ধারের ঘটনাসংক্রান্ত।



