লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার যে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি কেন ঘটেছে সে রহস্য এখনও উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। তবে স্থানীয় লোকজন এবং ওই ভবনের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পূর্বের একটি ঘটনা নিয়ে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন অভিযুক্ত যুবক।
ঘটনার বিবরণ
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড (দেনায়েতপুর) এলাকার একটি ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে। হামলার পর উত্তেজিত জনতার গণপিটুনিতে প্রধান অভিযুক্ত যুবকও নিহত হয়েছেন। কুপিয়ে হত্যার পর গণপিটুনির শিকার হন অভিযুক্ত যুবক অন্তর মজুমদার (৩০)। তিনি ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতা। আহত অবস্থায় তাকে দুপুরে ঢাকায় নেওয়ার পথে মারা যান।
নিহতরা হলেন- মা শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)।
নিহতদের পরিচয়
পুলিশ জানায়, শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তারা বেশ কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া আছেন। তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। মেজো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস একাডেমি থেকে এসএসসির ফলপ্রত্যাশী ছিল। একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল ছোট মেয়ে শিফা আক্তার। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহিনুরের স্বামী মো. কামাল হোসেন ২০১৯ সালে উপজেলার মোল্লারহাট এলাকায় রাস্তায় পড়ে থাকা তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। তিনি গ্রামে ঘুরে ঘুরে হাঁড়ি-পাতিল বিক্রি করতেন। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতেন শাহিনুর।
অভিযুক্ত যুবকের পরিচয় ও পূর্ব পরিচিতি
অভিযুক্ত ওই যুবক নোয়াখালীর বাসিন্দা হলেও রায়পুরে ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। এক বছর আগে শাহিনুরের ওই ভবনের একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন। সেখান থেকে তাদের মধ্যে পরিচয় হয়। নিহতদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পিটুনিতে নিহত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার। তিনি নোয়াখালীর সুবর্ণচরের কার্তিক মজুমদারের ছেলে এবং পেশায় একজন ফল বিক্রেতা। আগে একই ভবনের পাঁচতলার একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন এবং ওই পরিবারটির পূর্বপরিচিত ছিলেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ভবনের দুজন ভাড়াটিয়া নারী বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে স্কুলশিক্ষক আমির হোসেনের ভবনের পাঁচতলায় ভাড়া থাকতেন অন্তর মজুমদার। পাশাপাশি ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন। নিচতলায় তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন শাহিনুর বেগম। সেই সূত্রে শাহিনুর বেগমের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর মাঝেমধ্যে উত্ত্যক্ত করতেন। আজেবাজে কথা বলতেন। অন্তরের স্বভাব ভালো ছিল না। নেশা করতেন।
হত্যার কারণ
কয়েক মাস আগে শাহিনুরকে আজেবাজে কথা বললে তা নিয়ে দুজনের বাগবিতণ্ডা হয়। তখন শাহিনুরের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন অন্তর। আশপাশের লোকজনও তখন জড়ো হন। একপর্যায়ে বাড়ির মালিক আমির হোসেনকে জানালে অন্তরকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। চাপাচাপিতে বাধ্য হয়ে পরে বাসা ছেড়ে চলে যান অন্তর। কিন্তু চলে গেলেও ভেতরে ভেতরে যে ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছেন তা কারও জানা ছিল না। ওই ঘটনায় প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন।
আরেক প্রতিবেশী জানিয়েছেন, সকাল ৯টার দিকে শাহিনুরের বাসায় আসেন অন্তর। তখন তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে শাহিনুর ও তাদের মেয়েদের কুপিয়ে জখম করেন। এ সময় শাহিনুর চিৎকার দিলে অন্তর পালানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের ছয় সদস্য আহত হয়েছেন।
পাশের বাসার ভাড়াটিয়া রোকেয়া বেগম বলেন, ‘সকালে বাসার ভেতর থেকে চিৎকার শুনতে পাই। জানালা দিয়ে দেখি ওই ছেলেটি শাহিনুর ও তার মেয়েদের কুপিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তখন স্থানীয়রা ধরে পিটুনি দেয়।’
পুলিশের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লক্ষ্মীপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (রায়পুর সার্কেল) মো. আব্দুর রাশেদ বলেন, ‘হত্যার মোটিভ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এর মধ্যে অভিযুক্ত যুবকও মারা গেছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। আমাদের তদন্ত চলমান। তবে স্থানীয় লোকজন ও প্রতিবেশীরা আমাদের বলেছেন, ঘাতক অন্তরের চরিত্র ভালো ছিল না। এক বছর আগে ওই ভবনের পাঁচতলায় ভাড়া থাকতো। শাহিনুরকে বিরক্ত করতো। এরপর বাড়িওয়ালাকে বলে অন্তরকে বাসা থেকে বের করে দেন শাহিনুর। এ নিয়ে ক্ষিপ্ত ছিল। হয়তো প্রতিশোধ নিতে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। তবে এসব তথ্যও যাচাই-বাছাই করছি আমরা।’



